দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । মিল্টন শিকদার ।
চোখের এক পলক, মাত্র এক সেকেন্ডের তিন ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের প্রিন্টিং মেশিন ৩০টি ১০০ ডলারের নোট ছাপতে পারে। প্রতি সেকেন্ডে গড়ে ৯৫টি নোট। বছরের ৩৬৫ দিন, দিনের ২৪ ঘণ্টা, কোনো ছুটি বা বিশ্রাম ছাড়াই এই প্রক্রিয়া চলে। এ সংখ্যা শুধুমাত্র সিকিউরিটি চেক, প্রিন্টিং পারফেকশন ও কাটিংয়ে উত্তীর্ণ নোটের হিসাব।
তবু এই বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও বিশ্বের ডলারের চাহিদা কখনো পুরোপুরি মেটানো যায় না। কারণ আজকের বিশ্বে মোট ডলারের মাত্র ১০ শতাংশ কাগজের নোট আকারে বিদ্যমান। বাকি ৯০ শতাংশ শুধু কম্পিউটারের লেজার ব্যালেন্স বা ডিজিটাল সংখ্যা।
ফিজিক্যাল নোট ছাপানোর সীমা আছে। একদিনে ১-২ বিলিয়নের বেশি নোট ছাপা বাস্তবে সম্ভব নয়। কিন্তু ডিজিটালভাবে একদিনে শত শত বিলিয়ন ডলার তৈরি করা যায়, শুধু লেজারে কয়েকটি সংখ্যা যোগ করে। এটিই আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির মূল স্থাপত্য।
বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ২.৩–২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কাগজের নোট রয়েছে, যার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ছড়িয়ে আছে। বাকি সব ডলার ডিজিটাল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সময় রপ্তানিকারকের অ্যাকাউন্টে লেজার পয়েন্ট জমা হয়, আমদানিকারকের অ্যাকাউন্ট থেকে বিয়োগ হয়। এভাবেই দেশের বিদেশি মুদ্রা ভান্ডার বাড়ে-কমে, কাগজের নোট ছাড়াই।
১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে বোঝানো হয়েছিল যে, ডলারই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রিজার্ভের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুদ্রা। প্রতিটি ডলার নোটে লেখা “IN GOD WE TRUST” অর্থাৎ, আমরা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি, আপনারাও আমাদের ও আমাদের ডলারকে বিশ্বাস করুন।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুসারে দেশের গ্রস ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আইএমএফের কঠোর BPM-6 পদ্ধতিতে এটি ৩০.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার পার্থক্যের বেশিরভাগই “লকড”।
এর একাংশ Export Development Fund (EDF)-এ, একাংশ Bangladesh Infrastructure Development Fund (BIDF)-এ মেগা প্রকল্পের ঋণ হিসেবে, আর কিছু অংশ ব্যাংকগুলোর কমিটমেন্ট সাপোর্ট হিসেবে আটকে আছে। ফলে চাইলেই এ অর্থ ব্যবহার করা যায় না।
এখানে আমাদের প্রবাদটি স্মরণীয়: “টাকা যার কাছে থাকে, তার কথাই বলে।” বাংলাদেশ রিজার্ভের মালিক হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের হাতে। বড় অংকের ক্যাশ ডলার তুলে আনা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। ফেডের নিয়মে মোট ব্যালেন্সের মাত্র ৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশ আকারে পাওয়া সম্ভব।
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে কেন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়? সরকার তেল আমদানি করে ডলারে পেমেন্ট করে যা মূলত লেজার ব্যালেন্সের ডিজিটাল সমন্বয়। দেশীয় টাকায় এ পেমেন্ট সম্ভব নয়।
দাম না বাড়ালে পেট্রোবাংলার টাকার আয় কমে যায়, কিন্তু রিজার্ভের ডলার খরচ একই গতিতে চলতে থাকে। দাম বাড়ালেও রিজার্ভের চাপ কমে না, শুধু অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ে, যা বিদেশে ডলার কিনতে পারে না। এটি একটি অন্তহীন ফাঁদ।
নতুন সরকার প্রথমে দাম না বাড়িয়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সহায়তার আশায় ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টাকাকে শক্তিশালী করার একটি বিরল সুযোগ ছিল। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকে যুক্তিসঙ্গতভাবে শক্তিশালী করা। কিন্তু খোলা বাজারে ডলারের অবস্থান রক্ষায় নানা হস্তক্ষেপ দেখা যায়।
রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) খাত বছরে গ্রস ৪৫–৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে। কিন্তু কাঁচামাল, ফ্যাব্রিক, এক্সেসরিজ ও লজিস্টিক খরচ বাদ দিলে নেট ভ্যালু অ্যাডিশন মাত্র ১২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এ খাতে সরাসরি ৪৪ লাখ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষ যুক্ত।
অন্যদিকে, প্রবাসী শ্রমিকরা ২০২৪ সালে ২৬.৮ বিলিয়ন এবং ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে গিয়ে এ অর্থ পাঠান, অথচ পথে হয়রানি ও দেশে ফিরে অযথা হয়রানির শিকার হন।
একটি সহজ উপমা: যে গরু দিনে ৩০ লিটার দুধ দেয় তাকে জুতা পেটা করা হয়, আর যে ১২ লিটার দেয় তাকে ভিআইপি সম্মান দেওয়া হয়।
ডলারের অধিকাংশই আজ ডিজিটাল মায়া, আস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকা সংখ্যা। ফেড সরাসরি ঋণ দেয় না, বরং এজেন্টদের মাধ্যমে লেজার পয়েন্ট আকারে দেয়। ঋণগ্রহীতা দেশকে সেই ডলার পরিশোধ করতে হয় বাস্তব উৎপাদন, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় দিয়ে।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। আমদানি নির্ভরতা কমানো, নেট রপ্তানি বাড়ানো, প্রবাসীদের সুরক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা, এগুলোই আমাদের আর্থিক সার্বভৌমত্বের পথ।
ডলার ব্যবস্থার সুবিধা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতা ও অসমতা বুঝে স্মার্টভাবে চলতে হবে। শুধু ডিজিটাল সংখ্যার পিছনে ছোটার পরিবর্তে বাস্তব অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করাই আমাদের একমাত্র নিরাপদ পথ।
যতক্ষণ না আমরা এই মায়া স্পষ্টভাবে দেখতে পারব, ততক্ষণ এর জাল থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া কঠিন।
