লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

স্নিগ্ধ বুড়িগঙ্গার কূলে ফেলে আসা সেই দিনগুলো

প্রকাশিত: 04 অক্টোবর 2026

25 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । সেলিনা মহসিন ।

১৯৫৩ সালে আমার বাবা জনাব এম মহসিন, পিএসপি, তৎকালীন ঢাকায় পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে বদলি হন। ঢাকা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী। আমার বাবা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস অফিসার (আইপিএস) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বাবার কর্মজীবনে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র সতেরোটি জেলা ছিল।

পঞ্চাশের দশকে পুলিশের দায়িত্ব আজকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তারা শুধু আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বেই ছিলেন না, বরং অভিবাসন ও পাসপোর্ট, জেলাগুলো জুড়ে পাবলিক বাস ও অন্যান্য যানবাহনের সাবলীল চলাচল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। আর যেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত ছিল তাই বিশেষ করে যখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ঢাকা সফরে আসতেন তখন প্রোটোকল দায়িত্বও পুলিশের উপর বর্তাত।

আমাদের বাসভবন ছিল একটি অনেক বড় বাড়ি যা বাকল্যান্ড বাঁধ ও বুড়িগঙ্গা নদীর মুখোমুখি ছিল। প্রবাহমান নদী সব সময় সেখানে ছিল এবং তা জীবনের স্পন্দন হয়ে উঠেছিল। বাকল্যান্ড বাঁধে সবুজ গাছ, খোলা জায়গা এবং হাঁটার জায়গা ছিল। বাবা বলেছিলেন, এই বাঁধ অনেক আগে ঢাকা শহরের কমিশনার চার্লস বাকল্যান্ড নির্মাণ করেছিলেন শহরকে মৌসুমি বন্যা থেকে রক্ষা করতে, নদীর তলদেশের  ক্ষয় রোধ করতে এবং সদরঘাট থেকে যাত্রী ও পণ্যবাহী জলযানগুলোর অবাধ চলাফেরা সহজ করতে। কিন্তু ওই সময় এখনকার মতো এত জলযান ছিল না, এজন্যই নদী মৃদু প্রবাহমান হলেই রোদে ঝলমল করত।

আমাদের বাড়ি ছিল একটি পুরনো ঔপনিবেশিক ভবন। বাদামী কাঠের মেঝে, ছাদ থেকে  মেঝে পর্যন্ত ফরাসি জানালা। কক্ষগুলো ছিল বিশাল এবং ডাইনিং রুম তো ছিল অনেক বড়, যেখানে ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত তিনটি ফরাসি জানালা। আমাদের বাসায় অতিথি এলে, দুপুরের খাবার শেষ করে পাতা হত তাস খেলার টেবিল।  কফির কাপে চুমুকের সাথে তাস খেলা শুরু হতো। চলতো গল্প আর আড্ডা।  তারা ‘জিন রামি’ নামক তাস খেলা খেলতেন। পরিবেশ ছিল মনোরম ও উপভোগ্য। অন্য বড় ঘরটি ছিল আমাদের বাবা-মায়ের শোবার ঘর। আমাদের নিজেদের কক্ষগুলো উল্টোদিকে সবুজ গাছের দিকে মুখ করে।

মাঝে মাঝে আমরা বাকল্যান্ড বাঁধে হাঁটতাম, যেখানে শহরের মানুষরা অবসর সময়  হাঁটতেন। নদীতীরের এক অংশে ছিল সবুজ পাতায় মোরা ঝোপালো গাছ। বাবা বলতেন এটি একটি ছোট পার্ক যেখানে একটি উঁচু মঞ্চ ছিল যেখানে সফররত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বাগত জানানো হত। দুপুরে পুলিশ ব্যান্ড বাজাত আর মানুষরা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিত এবং নদীর শীতল বাতাসে প্রাণ ভরে উপভোগ করত। তিনি আরও বলতেন যে ব্যান্ড বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হতোনা, যদি না গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সফরে আসতেন।

আমাদের বাগানের এক পাশে একটি ছোট খাঁড়ি ছিল। যেখানে দুটি বড় প্রশস্ত লঞ্চ নোঙর করা থাকত। বাবাকে জেলার সব পুলিশ থানা পরিদর্শন করতে হত। এই থানার অনেকগুলোতেই সড়ক পথে যাওয়ার উপায় ছিল না। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা কয়লাচালিত প্রশস্ত লঞ্চ তৈরি করেছিল সড়ক পথ না থাকা ওই থানাগুলোতে যেতে। এই লঞ্চগুলোর দুটি আমাদের সামনের বাগানের কোণের খাঁড়িতেই নোঙর করা থাকত।  আমাদের বাগান থেকে লঞ্চে যেতে একটি চওড়া কাঠের তক্তা ছিল। লঞ্চগুলোর নাম ছিল ‘স্টেলা’ ও ‘মিরান্ডা’।

আমাকে লঞ্চে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল কিন্তু কোনো কোনো দুপুরে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো, আমি চুপিচুপি ওই কাঠের তক্তা পেরিয়ে লঞ্চে যেতাম। জীবন ছিল রোমাঞ্চকর। লঞ্চের সারেং ছিলেন একজন বয়স্ক মানুষ, তিনি আমাকে লঞ্চ ঘুরিয়ে দেখাতেন এবং তাঁর জীবনের সুন্দর সব ঘুরে বাড়ানোর গল্প শোনাতেন আমাকে। তারপর আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার চুপিচুপি কাঠের তক্তা পেরিয়ে বাগানে ফিরে আসতাম। একবার আমাদের মালী আমাকে দেখে ফেলেছিলেন, কিন্তু তিনি আমাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন কাউকে কিছু বলবেননা।

আমাদের বাড়ির কাছে ছিল ওয়াইজ ঘাট নামে একটি জেটি ও একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ। এর থেকে আরেকটু দূরে ছিল নবাবের প্রাসাদ ‘আহসান মঞ্জিল’। এটি ছিল খুবই আকর্ষণীয় একটি প্রাসাদ যার বিশাল গম্বুজ ও একটি বিরাট সিঁড়ি যা ২য় তলা থেকে সোজা নদীতীর পর্যন্ত নেমে এসেছিল। তখন আহসান মঞ্জিলের অবস্থা ছিল বেশ খারাপ। আমার বাবা বলেছিলেন, নবাবদের অবস্থা তখন খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অনেক বছর পর রাষ্ট্রপতি এরশাদ প্রাসাদটি সংস্কার করেন এবং এখন এটি একটি পর্যটন স্থান।

এক সকালে আমার বাবা আর আমি নাশতা করছিলম, এমন সময় একটি টেলিগ্রাম আসে। টেলিগ্রামটি নিয়ে এসেছিল বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর মারা যাওয়ার হৃদয়বিদারক দুঃসংবাদ। ছাত্রজীবনে আমার বাবা ও বুল্বুল চৌধুরী  কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে এক সঙ্গে পড়াশোনা করতেন।  পরবর্তী সময়ে বুলবুল চৌধুরী দেশে ও বিদেশে তাঁর নৃত্যনাট্যের জন্য পরিচিত হয়েছিলেন। যখন ওনার কাছে যথেষ্ট টাকা থাকতো না তখন তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে আমাদের ঔপনিবেশিক আমলের বাড়িতে এসে থাকতেন। বাবা তখন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় বুলবুল চৌধুরীর জন্য কয়েকটি নৃত্যানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতেন। তারপর যখন তাঁর যথেষ্ট টাকা জমা হত তিনি তাঁর নাচের দল নিয়ে বিদেশে নৃত্যসফরে চলে যেতেন।

বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যুতে বাবা বেশ শোকার্ত ছিলেন এবং তিনি তাঁর প্রয়াত বন্ধুর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কিছু একটা করতে চাইছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে প্রয়াত জনাব ওয়াইজের প্রাসাদটিতে তাঁর বন্ধুর নামে একটি সঙ্গীত স্মৃতি একাডেমী হয়ে উঠবে। বাবা প্রধান সচিবের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি পান এবং প্রয়াত জনাব ওয়াইজের প্রাসাদটি খালি করেন যা তখন সিআইডি পুলিশ অফিস ছিল।

যখন এটি খালি ও সংস্কারাধীন ছিল বাবা আমাকে নিয়ে জনাব ওয়াইজের প্রাসাদ দেখতে যান। আমি উত্তেজনায় রুদ্ধশ্বাস হয়ে যাই। এটিরবিন্যাস ছিল উত্তরদক্ষিণে,  ক্রস ভেন্টিলেশনের জন্য। আমি অভিভূত হয়ে যাই বিশাল স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো দ্বিতল বারান্দার মসৃণ বিস্তার দেখে। কক্ষগুলো ছিল বিশাল এবং দরজাগুলো নদীর দিকে খুলত। সেই বিশাল কক্ষগুলোর ছাদ এত উঁচু ছিল যে ভারী কাঠের বিম দেখতে আমাকে মাথা পুরোপুরি পেছনে হেলাতে হত। একটি জাঁকজমকপূর্ণ সিঁড়ি ছিল। বাবা আমাকে সূক্ষ্ম খোদাই দেখিয়ে বললেন যে প্রাসাদটি আসলে নির্মাণ করেছিলেন একজন আর্মেনীয় নিকোলাস পোগোজ। যে ছিল একজন প্রভাবশালী জমিদার ও ঢাকার ধনী আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের সদস্য।

পরে এটি বিক্রি করা হয় প্যাট্রিক ওয়াইজের কাছে যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট ধনী ব্রিটিশ নীলকর ও জমিদার। আমি কখনো এমন জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ দেখিনি। সেখানে একটি জেটি ছিল যার নাম ‘ওয়াইজ ঘাট’ জনাব ওয়াইজের নামানুসারে।

প্রাসাদ থেকে আমি একা সুন্দর সিঁড়ি বেয়ে বাগানে নেমে যাই কারণ বাবা ওই সময় একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে প্রাসাদের ভিতরের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। বিশাল বাগানটি ছিল খালি ও বুনো ফুলে ভর্তি। কোনো মালী দেখাশোনা করত না। কিছু সুন্দর ফুলের গুল্ম ছিল মিষ্টি সুগন্ধে ভরপুর। অতিরিক্ত আগাছা ঠেলে আমি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ দিয়ে ঘোড়ার আস্তাবল ও গাড়িঘরের দিকে হাঁটলাম। সেগুলো ছিল অন্ধকার ও ছায়াময়।

হটাৎ বাবা আমার কাছে চলে এলেন, আস্তাবল ও গাড়িঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন এগুলো ভেঙে ফেলা হবে এবং বড় খোলা জায়গাটি সঙ্গীত অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হবে।

১৯৯৫ সালের মে মাসে জনাব ওয়াইজের প্রাসাদটি হয়ে ওঠে ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ (বিএএফএ)। আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ হয়, বন্ধুত্বের এক নিদর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়। সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, তবলাবাদক ও যন্ত্রবাদকরা একত্রিত হন এবং শিক্ষার্থীরা নৃত্য ও সঙ্গীতশিল্প শিখতে আসেন। আমার বড় বোন গিটার শিখতে চেয়েছিলেন, আমরা যতীন অ্যান্ড কোম্পানিতে গিয়ে তাঁর জন্য একটি হাওয়াইয়ান গিটার কিনি। প্রতি সপ্তাহের শেষে তিনি গিটার বাজানো শিখতে যেতেন। একদিন আমি আমার বোনের গিটার বাজানো দেখতে যাই। তিনি স্টিলের বার দিয়ে তারগুলো চেপে ধরছিলেন। তাঁর শিক্ষক সমর দাস বললেন তিনি তাঁকে কিছু মনোরম গিটারের সুর শেখাবেন। যখন তিনি বাজালেন অসাধারণ সুরগুলো বারান্দা ও নদীর উপর দিয়ে যেন নদীর জলের মতোই প্রবাহিত হয়ে গেল। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

শীঘ্রই কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেন যে পুলিশ লাইন যেখানে আমাদের বিশাল বাড়ি ছিল তা এই বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনীর জন্য খুবই পুরনো, ছোট ও ঘিঞ্জি। তাই ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে তা স্থানান্তরিত হয় এবং আমরা আমার প্রিয় বাড়ি ও ঝলমলে বুড়িগঙ্গা ছেড়ে রাজারবাগে নতুন বড় বাড়িতে চলে যাই। আমি আমার পুরনো বাড়ির শূন্যতা খুব অনুভব করতাম কিন্তু সেই সময়ের স্বপ্নের মতো স্মৃতি চিরকাল আমার সঙ্গী হয়ে থেকে যায়।

লেখক একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত।

লেখাটি লেখকের ইংরেজী লেখা থেকে অনুবাদ করা

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman