দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । সালাহ উদ্দিন টিটো ।
আমেরিকা ও ইসরায়েল জানে, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য মিষ্টি পানি অনেকটা ডুবুরিদের কাঁধে বহন করা অক্সিজেনে সিলিন্ডারের মতোই, এখানে সুপেয় পানির প্রাকৃতিক উৎস নেই বললেই চলে। তবুও তারা সেই পানিকে জেনে-বুঝে সুপরিকল্পিতভাবে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে অত্যান্ত ঠান্ডা মাথায়। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। যেখানে তৃষ্ণাকে সম্পূর্ণ একটি অঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। আর তৃষ্ণা হল সবচেয়ে ধীর, সবচেয়ে নির্মম মৃত্যু।
এই তথ্য নতুন নয়। ১৯৮৩ সালেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র গোপন নথিতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল: উপসাগরীয় দেশগুলোর শহরগুলো তাদের খাবার পানির জন্য সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল। ডিস্যালাইনেসন প্লান্ট বা লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রগুলোই তাদের জীবনরেখা। সেই জীবনরেখার উপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো নগর ব্যবস্থা। আজকের বাস্তবতায় এই নির্ভরতা আরও গভীর হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বের মোট লবণমুক্তকরণ পানির প্রায় ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে, ৪০০টিরও বেশি ডিস্যালাইনেসন প্লান্ট এর মাধ্যমে। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলো খুব কম জায়গায় কেন্দ্রীভূত। মাত্র কয়েক ডজন বড় কেন্দ্র থেকে আসে দেশগুলোর অধিকাংশ পানি। এগুলো উপকূলবর্তী, অরক্ষিত এবং আক্রমণের জন্য অত্যন্ত সহজ লক্ষ্য।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পানির মোট চাহিদার প্রায় ৪১-৫২ শতাংশ এবং খাবার পানির একটি বড় অংশ আসে লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালাইনেসন প্লান্ট থেকে। কাতারে এই হার ৭৭ শতাংশেরও বেশি, খাবার পানিতে প্রায় ৯৯ শতাংশ। কুয়েতে মোট পানির ৪২-৪৭ শতাংশ এবং খাবার পানির ৯০ শতাংশ। বাহরাইনে মোট পানির ৫৯-৬৭ শতাংশ এবং খাবার পানির ৯০ শতাংশেরও বেশি। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একই চিত্র,খাবার পানির ৭০ শতাংশ পর্যন্ত এই কৃত্রিম উৎসের উপর নির্ভরশীল।
এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ হলে কী হবে? হাসপাতালের অপারেশন থেমে যাবে। বিদ্যুৎ থাকলেও জীবন থেমে যাবে। শহরগুলোতে পানি থাকবে না। নগরবাসীরা শ্বাসরোধের মতো ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পড়বে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরী হবে এবং নিঃসন্দেহে রাজতন্ত্র হুমকীর মুখে পড়বে। যুদ্ধ তখন শুধু বোমা-বুলেট নয়, তৃষ্ণা হয়ে উঠবে সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। রাজাধিরাজ হিসেবে নিজেদের মসনদ টিকাতে যে কোনো পর্যায় পর্যন্ত যাবে এই শাসককুল।
অন্যদিকে ইরানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাকৃতিক উৎসে ভরপুর এই দেশটি সমুদ্রের উপর এতটা নির্ভরশীল নয়। ডিস্যালাইনেসন প্লান্ট এর উপর তার নির্ভরতা মাত্র ২ শতাংশের মতো। নদী, ভূগর্ভস্থ পানি এবং বৃষ্টিপাতের উপর ভিত্তি করে তার জলসম্পদ অনেক বেশি স্থিতিশীল। অর্থাৎ, যুদ্ধের মানচিত্রে ভারসাম্য আগে থেকেই টিল্ট করা। কে কতটা ভাঙবে, কোথায় কতটা চাপ পড়বে, সব হিসাব করা ছিল।
আমেরিকা ও ইসরায়েল এই হিসাব জানত। তবু তারা পানি নিয়ে সংঘাতের পথ খুলে দিয়েছে। কেন? কারণ এটা তাদের কৌশলের অংশ। উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরো আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাদের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, রাজাদের ক্ষমতার নিশ্চয়তা প্রদান করা। মার্কিন-ইসরাইল জোট তাদের কৌশলগত মিত্রদের তেল, বাণিজ্য ও পুরো অঞ্চলকেই এমন একটা অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে শুধু নিজেদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য। যেখানে পানির উৎস ধ্বংস হয়ে যাবে, তৃষ্ণা গোটা অঞ্চলের মানুষকে চেপে ধরবে আর অশুভ প্রভুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ঠান্ডা মাথার হিসাব।
এই হিসাবের যৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট হয় সাম্প্রতিক ঘটনায়। চলমান সংঘাতে ইতিমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর ডিস্যালাইনেসন প্লান্ট আক্রমণ হয়েছে। একটি মজার ব্যাপার লক্ষণীয় , ইরান যখন ঘোষণা দিলো, যেই অঞ্চল বা দেশ থেকে ইরানের যেসব স্থাপনায় হামলা চালানো হবে, ইরানও তার চেয়ে বেশী শক্তি ব্যাবহার করে ওই দেশ বা অঞ্চলের ওই একই ধরনের স্থাপনায় আঘাত করবে। মধ্যপ্রাচ্চের ভূমি ব্যবহার করে আমেরিকা ও ইজরাইল ইরানের ডিস্যালাইনেসন প্লান্ট আক্রম কর, এর ফলে বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ও সৌদি আরবের ডিস্যালাইনেসন প্লান্টগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হয়। ফলাফল ব্যাপক ধ্বংস ও অনিশ্চয়তা।
ইরানের কিছু কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু ইরানের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম, কারণ তার প্রাকৃতিক বিকল্প রয়েছে। অথচ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এটা জাতীয় সংকট। মাত্র কয়েকটি কেন্দ্র ধ্বংস হলেই লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। আমেরিকা-ইসরায়েল জানত এই দুর্বলতার কথা। তবু তারা এমন পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে তাদের মিত্র দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে তৃষ্ণার শিকার হতে হবে, এটিও তাদের দর কষাকষি হিসাবের অংশ। এটা কি শুধু যুদ্ধের অংশ? না, এটা মানবতার বিরুদ্ধে একটা ঠান্ডা গণহত্যার কৌশল। পানিকে অস্ত্র বানানো।
সবাই দেখছে, এমনকি আরব-উপদ্বীপের লোকেরও, কিন্তু রাজাদের কাছে তারা অসহায়। প্রশ্নটা এখন আর শুধু যুদ্ধ হবে কি না, তা নয়। প্রশ্নটা হল পানি বন্ধ হলে, কে কতক্ষণ টিকবে থাকবে? উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিকরা কি তাদের বাদশাহদের মিত্রদের এই হিসাবের বলি হবে? তৃষ্ণা যুদ্ধের এই কলম হয়ত নতুন ইতিহাস লিখবে, কিন্তু কথা হলো ঠিক কতটা ত্যাগের বিনিময়ে?
এই সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক যুদ্ধে তেলের চেয়েও পানি অনেক বেশি মূল্যবান। আর যারা গণমানুষের মৌলিক অধিকার পানিকে অস্ত্র বানায়, তারা কখনো শান্তির পক্ষে নয়। তারা শুধু নিজেদের আগ্রাসী স্বার্থের পক্ষে। এই যুদ্ধ প্রমান করে দিল মানুষের জীবন শুধুই একটা হিসাবের অংশ।
