দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। দুই দেশ দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগী। উত্তর আমেরিকার আকাশ ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তায় তারা একসঙ্গে কাজ করে। তবু সেই প্রায় অকল্পনীয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের মতো চরম ঝুঁকিকেও তাঁর সরকার বিবেচনায় নিয়েছে। তাঁর ভাষায় এটি সম্ভাব্য যুদ্ধের পূর্বাভাস নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ।
কার্নি সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কোনো রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির দায়িত্ব হলো এমন পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা যার সম্ভাবনা খুব কম কিন্তু যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কানাডা সরকারের মূল অনুমান নয়। তবে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি না নেওয়াকে তিনি দায়িত্বহীনতা হিসেবে দেখছেন।
এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার মন্তব্য। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা নাকচ করলেও কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহারের কথা বলেছিলেন। তৎকালীন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিলেন যে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হবে না।
কেন হামলার আশঙ্কা এত কম
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ। দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। উত্তর আমেরিকার আকাশসীমা নজরদারি ও প্রতিরক্ষার জন্য তারা যৌথভাবে উত্তর আমেরিকার মহাকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড পরিচালনা করে। ২০২৬ সালেও দুই দেশের বাহিনী নিয়মিত যৌথ মহড়া ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছে। কানাডার সরকারি নথিতেও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে।
কানাডা একই সঙ্গে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের ন্যাটো সম্মেলনের পর দেশটি প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো, নতুন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, আর্কটিক অঞ্চলে উপস্থিতি জোরদার এবং সাইবার প্রতিরক্ষা উন্নয়নের পরিকল্পনা জানিয়েছে। কানাডা ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের পাঁচ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যের পথেও এগোচ্ছে।
যুদ্ধ হলে কী হতে পারে
কানাডার সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক ছোট। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কানাডার নিয়মিত বাহিনীতে প্রায় ৬৭ হাজার ৮০০ সদস্য এবং প্রাথমিক রিজার্ভে প্রায় ২৫ হাজার ১০০ সদস্য ছিল। একই সময়ে দেশটি আরও বড় রিজার্ভ কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে প্রায় তিন লাখ স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ সদস্যের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
কানাডার সামরিক পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার একটি কাল্পনিক পরিস্থিতিও বিবেচনা করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রচলিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান দ্রুত হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি বিকল্প প্রতিরোধ কৌশল বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
তবে বাস্তবে এমন যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও তা সহজ হবে না। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতা রয়েছে। উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দুই দেশের সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিপর্যয়ও তৈরি হবে।
এই কারণেই কানাডার বর্তমান প্রস্তুতিকে আসন্ন যুদ্ধের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
কানাডার জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত মানসিকতায়। যে দেশ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘনিষ্ঠ মিত্র ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখেছে, সেই দেশ এখন একই প্রতিবেশীকে সম্ভাব্য চরম ঝুঁকির তালিকায় রাখছে। হামলার সম্ভাবনা যতই কম হোক, কানাডার নেতৃত্বের এই প্রস্তুতি উত্তর আমেরিকার পুরোনো নিরাপত্তা সমীকরণ যে বদলাচ্ছে তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
সূত্রঃ বিবিসি, রয়টার্স, ব্লুমবার্গ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য আ
