দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি সুড়ঙ্গ থেকে নয় দিন পর দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, দেশটির রসুয়া জেলার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। এই উদ্ধারকে প্রায় এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযানে বিরল সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিক হলেন ৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় শাহ ও ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন। সঞ্জয় যান্ত্রিক ফোরম্যান এবং কবির যান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতেন। উদ্ধারের পর তাদের চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সঞ্জয়ের আঘাত গুরুতর নয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে কবিরের হাত ও পা নড়াচড়ায় সমস্যা হচ্ছে।
নেপাল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা কাদামাটিতে ভরা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একজন শ্রমিককে বের করে আনছেন। বাইরে আসার পর তাকে দাঁড়াতে সহায়তা করেন উদ্ধারকর্মীরা। অপর শ্রমিককে কাদায় আচ্ছাদিত অবস্থায় কমলা রঙের স্ট্রেচারে করে বের করে আনা হয়। উদ্ধারের দৃশ্য দেখে ঘটনাস্থলে থাকা উদ্ধারকারীদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
নেপাল সরকারের কর্মকর্তারা জানান, ২৬ আগস্ট ত্রিশূলী নদীর উজানে হিমবাহ, পাথর ও কাদার বিশাল ধস নেমে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোত নদী উপত্যকার বিভিন্ন স্থাপনা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কয়েকশ শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
রয়টার্স জানিয়েছে, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সুড়ঙ্গে অন্তত ৯০০ মানুষ আটকা পড়েছেন বলে উদ্ধারকারী ও কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা থাকতে পারেন। ফলে ত্রিশূলী-৩এ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা অন্য নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানেও নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
উদ্ধারের আগে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ক্ষীণ সাড়া পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। অস্ট্রেলীয় সুড়ঙ্গ উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালের উদ্ধারকারীদের পরামর্শ দিচ্ছিলেন এবং পরে নিজেও ঘটনাস্থলে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। উদ্ধারকারীরা ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্দেশে কথা বললে সেখান থেকে ক্ষীণ সাড়া পাওয়া যায় বলে তিনি জানান। এরপর উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়।
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ আটকে থাকা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে এগিয়ে যান। দীর্ঘ সময় ধরে কাদা, পাথর ও অন্যান্য বাধার মধ্যেও অভিযান চালিয়ে অবশেষে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। দুর্যোগের প্রভাবে জলবিদ্যুৎ খাতও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূমির আকস্মিক ধস থেকে সৃষ্ট বন্যা নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বসতি, সড়ক ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে পাহাড়ের একটি বড় অংশের হিমবাহ ও শিলাস্তর ধসে পড়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় নেপালের উদ্ধার অভিযানে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী অন্যান্য সুড়ঙ্গেও অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন জীবিত আরও শ্রমিকের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
