দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন সৌরভ মিয়া। হঠাৎ নদীর বুক থেকে ভেসে আসে আর্তচিৎকার, ‘বাঁচাও, বাঁচাও’। মুহূর্তেই বদলে যায় বিকেলের সেই স্বাভাবিক পরিবেশ। নিজের জীবনের ঝুঁকি জেনেও পানিতে ঝাঁপ দেন ১৮ বছর বয়সী সৌরভ। স্রোতের টানে তলিয়ে যেতে থাকা মানুষদের মধ্যে দুজনকে তিনি তীরে তুলে আনতে সক্ষম হন। তৃতীয়জনকে উদ্ধারে আবার পানিতে নামার পর প্রবল স্রোত তাঁকেই টেনে নেয় গভীরে। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর উদ্ধার হয় তাঁর নিথর দেহ।
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর এলাকায় শুক্রবার বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদীতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও উদ্ধারকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় কয়েকজন নদীতে গোসল করতে নেমেছিলেন। প্রবল স্রোতে তাঁদের কয়েকজন বিপদে পড়েন। সৌরভ তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে যান।
সৌরভ লাখপুর গ্রামের কৃষক মজনু মিয়ার ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বড় ভাই হযরত আলী প্রবাসে থাকেন এবং ঘটনার কিছুদিন আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। সংসারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি সৌরভ। স্থানীয় একটি সারের দোকানে কাজ করে পরিবারকে সহযোগিতা করতেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মাহফুজুর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, নদী থেকে মানুষের চিৎকার শুনে সৌরভসহ কয়েকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পানিতে কয়েকজনকে হাবুডুবু খেতে দেখে সৌরভ প্রথমে ঝাঁপ দেন। দুজনকে নিরাপদে তীরে তুলে আনার পর তিনি জানান, পানির নিচের স্রোত খুব শক্তিশালী। এরপর অন্যদের উদ্ধারে আবার পানিতে নামেন। একবার ডুব দেওয়ার পর আর ওপরে উঠতে পারেননি।
শুক্রবার বিকেল থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। সন্ধ্যার পর অন্ধকার ও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে অভিযান স্থগিত করা হয়। শনিবার সকালে ভৈরব থেকে আসা ডুবুরি দল আবার তল্লাশি শুরু করে। পরে সৌরভসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপর নিখোঁজ তরুণ শান্তকে উদ্ধারে অভিযান চলছিল।
সৌরভের স্বজনেরা জানিয়েছেন, পরিবারের ছোট ছেলেটির এমন মৃত্যু তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের ভাষ্যেও সৌরভের মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়ার স্বভাবের কথা উঠে এসেছে। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে অন্যদের বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেওয়াই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
শীতলক্ষ্যায় এ ধরনের দুর্ঘটনায় পানির গভীরতা ও স্রোতের আকস্মিক পরিবর্তনকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন উদ্ধারকারীরা। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সময় প্রবল স্রোত বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং নিখোঁজদের সন্ধানে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালাতে হয়।
সৌরভের মৃত্যু তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়। এটি এক তরুণের সাহস ও মানবিকতার গল্পও। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন হারানো এই তরুণের শেষ মুহূর্তের সেই সিদ্ধান্ত এখন শীতলক্ষ্যার তীরে শোকের পাশাপাশি এক গভীর প্রশ্নও রেখে গেছে, বিপদের মুহূর্তে মানুষকে বাঁচাতে ছুটে যাওয়ার আগে নিরাপদ উদ্ধারব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের নিশ্চয়তা কতটা আছে?
