বাংলাদেশে নারী শিক্ষার যে ভিত্তি আজ দৃশ্যমান, তা হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে আছে কিছু সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কিছু সময়োচিত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং একজন রাষ্ট্র নেতার স্পষ্ট উপলব্ধি যে, মেয়েদের শিক্ষিত না করলে দেশ এগোবে না। সেই উপলব্ধির বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া ছিল ব্যতিক্রম, কিছুটা সামাজিক নিয়ম বিরুদ্ধ। দারিদ্র্যতা, সামাজিক বাধা ও বাল্যবিবাহ মেয়েদের শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়ার সরকার গ্রামীণ মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করেন এবং চালু করেন উপবৃত্তি কর্মসূচি। এটি কোনো সাধারণ নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, ছিল একটি সামাজিক অঙ্গীকার, রাষ্ট্র বলছে, মেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব সে নেবে।
এই উদ্যোগের ফল দ্রুত দেখা যায়। স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতি বাড়ে, ঝরে পড়ার হার কমে, বাল্যবিবাহের প্রবণতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে। যে কর্মসূচিকে একসময় ‘ঝুঁকিপূর্ণ ব্যয়’ বলা হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে এমন একটি সফল মডেলে পরিণত হয়, যা পরের সরকারগুলো বাতিল করার সাহস পায়নি। বরং সেটিকে ধরে রাখতে বাধ্য হয়েছে।
নারী শিক্ষার ভিত গড়তে প্রাথমিক স্তরেও ছিল তাঁর সরকারের মনোযোগ। ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ ও প্রাথমিক শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি শুধু স্কুলমুখী শিশুর সংখ্যা বাড়ায়নি, দরিদ্র পরিবারে শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিল। এর সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগের কোটা যুক্ত হওয়ায় গ্রামীণ অভিভাবকদের আস্থা বেড়েছে। মেয়েরা নিরাপদ পরিবেশে পড়তে পারবে, এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্ত করতে আলাদা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে, নারী শিক্ষা তাঁর কাছে কোনো আনুষঙ্গিক বিষয় ছিল না, ছিল রাষ্ট্র গঠনের কেন্দ্রীয় উপাদান।

এই নীতিগুলোর সামাজিক প্রভাব আজও দৃশ্যমান। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ নারীর অংশগ্রহণ, নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, গ্রামীণ সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মেয়েদের উপস্থিতি, সবকিছুর শিকড় রয়েছে সেই শিক্ষানীতিতে যার প্রণেতা ছিলেন বেগম জিয়া। নারী শিক্ষার এই অগ্রযাত্রা না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো আজকের জায়গায় পৌঁছাত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকেই।
নারী উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বেগম রোকেয়া পদক প্রবর্তনও ছিল প্রতীকী নয়, বরং বাস্তবমুখী প্রেরণাদায়ী। রাষ্ট্র জানিয়ে দিয়েছিল, নারীর অগ্রগতি কেবল কথার বিষয় নয়, এটি জাতীয় অগ্রগতি ও সম্মানের প্রশ্ন।
বিশ্বব্যাংক ও ইউএনএফপিএ যখন এই উপবৃত্তি মডেলকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন সেটি ব্যক্তিগত কোনো কৃতিত্ব নয়, ছিল বাংলাদেশের একটি সঠিক পথ বেছে নেওয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
রাজনীতির নানা বিতর্কের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার যে নীরব বিপ্লব, তার স্থপতিদের অন্যতম ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ইতিহাসের বিচারে হয়তো আরও অনেক কিছুই আলোচিত হবে, কিন্তু মেয়েদের হাতে বই তুলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তগুলো তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে চির স্মরণীয় করে রাখবে।

লেখক
খন্দকার আজিজুর রহমান
হেড অব ফটোগ্রাফি
দ্য ডেইলি অবজার্ভার
