লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

৯২ হিজরি, রমজান মাস, আন্দালুস বিজয়ের সূচনা

প্রকাশিত: 21 ফেব্রুয়ারী 2026

84 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।

৯২ হিজরি, রমজান মাস। উত্তর আফ্রিকার উপকূল থেকে একদল মুসলিম সৈন্য জাহাজে চড়ে অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরের সেই সরু জলপথ, যা আজ পরিচিত জিব্রাল্টার প্রণালী নামে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন উমাইয়া শাসনের অধীনস্থ দক্ষ সেনাপতি তারিক ইবন জিয়াদ। এই অভিযানের মধ্য দিয়েই আইবেরীয় উপদ্বীপে মুসলিম শাসনের সূচনা হয় এবং ইতিহাসে জন্ম নেয় নতুন অধ্যায়— আন্দালুস।

প্রেক্ষাপট
সপ্তম ও অষ্টম শতকে উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় স্পেন ও পর্তুগালজুড়ে বিস্তৃত আইবেরীয় উপদ্বীপ ছিল ভিসিগথদের নিয়ন্ত্রণে। ভিসিগথ রাজ্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে, স্থানীয় কিছু গোষ্ঠীও তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল।

এই পরিস্থিতিতে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মূসা ইবন নুসাইর সীমিত পরিসরে এক সামরিক অভিযান অনুমোদন করেন। সেই অভিযানের নেতৃত্ব পান তারিক ইবন জিয়াদ।

জিব্রাল্টারে অবতরণ
৭১১ খ্রিস্টাব্দে (৯২ হিজরি) তারিক প্রায় সাত হাজার সৈন্য নিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে অবতরণ করেন। যে পাহাড়ে তিনি নেমেছিলেন, সেটিই পরবর্তীকালে তার নামানুসারে “জাবাল আল-তারিক” নামে পরিচিত হয়, যা বিকৃত হয়ে আজকের “জিব্রাল্টার”।

ইতিহাসে প্রচলিত আছে, অবতরণের পর সৈন্যদের মনোবল দৃঢ় করতে তারিক অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দেন। যদিও সেই ভাষণের শব্দবিন্যাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবে এতে সন্দেহ নেই যে ছোট বাহিনী নিয়েও তারা অসাধারণ সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন।

গুয়াদালেতে যুদ্ধ
আইবেরীয় শাসক রডেরিক (রুদরিক) মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। দুই বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় গুয়াদালেতে নদীর তীরে। কয়েক দিনব্যাপী তীব্র যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ভিসিগথ বাহিনী পরাজিত হয় এবং রাজা রডেরিক নিহত বা নিখোঁজ হন।

এই বিজয় ছিল মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। এরপর দ্রুতগতিতে মুসলিম বাহিনী কর্ডোভা, তোলেদোসহ গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলো দখলে নেয়। পরবর্তীতে মূসা ইবন নুসাইর নিজেও অতিরিক্ত বাহিনী নিয়ে এসে অভিযানকে আরও বিস্তৃত করেন।

প্রশাসন ও সংস্কৃতির বিকাশ
আন্দালুসে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর শুধু সামরিক সাফল্যই নয়, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরও শুরু হয়। কর্ডোভা একসময় ইউরোপের অন্যতম প্রধান নগরীতে পরিণত হয়। এখানে গড়ে ওঠে বিশাল গ্রন্থাগার, শিক্ষাকেন্দ্র ও গবেষণার পরিমণ্ডল।

চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন ও স্থাপত্যে আন্দালুস বিশেষ অবদান রাখে। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি পণ্ডিতদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার এক অনন্য সহাবস্থান তৈরি হয়। এই জ্ঞানভাণ্ডার পরবর্তী সময়ে ইউরোপের রেনেসাঁ আন্দোলনে প্রভাব ফেলে বলে বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য
আন্দালুস বিজয় শুধু একটি ভূখণ্ড দখলের ঘটনা নয়; এটি ছিল সভ্যতার বিনিময়ের সূচনা। মুসলিম শাসনের অধীনে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রায় আট শতাব্দী ধরে যে সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চা বিকশিত হয়, তা ইউরোপীয় ইতিহাসে গভীর প্রভাব রাখে।

রমজান মাসে সূচিত এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ইসলামী সভ্যতা ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে যায়। আন্দালুস তাই ইতিহাসে কেবল সামরিক বিজয়ের নয়, জ্ঞান ও সংস্কৃতিরও এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman