দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে যে রঙিন, আনন্দময় মিছিল বের হয়। বিশাল মুখোশ, পাপেট, পাখি,মাছ, পেঁচা, বাঘে ও ঘোড়ার প্রতিকৃতি নানান লোকজ উপাদানে সাজানো এবং সেজে উচ্ছাস প্রকাশ করে নাচে-গানে মেতে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, তাকে বলা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। কিন্তু প্রশ্ন উঠে: এই শোভাযাত্রা কি বাংলাদেশের সংস্কৃতির ‘আবহমান কাল’ থেকে চলে আসা ঐতিহ্য? পহেলা বৈশাখের দিন আবহমান বাংলায় কী করা হতো? আর বাঙালি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখের গুরুত্বই বা কী?
মঙ্গল শোভাযাত্রা আবহমান কালের ঐতিহ্য নয়। এর সূচনা হয়েছে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্যোগে। প্রথমে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। এর পেছনে ছিল স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। ১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রহীনতা ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের সময় চারুকলার শিক্ষার্থীরা এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আশা ও ঐক্যের বার্তা দিতে চেয়েছিলেন।
এর আগে ১৯৮৫ সালে যশোরে চারুপীঠ (প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী এস এম সুলতানের অনুপ্রেরণায়) প্রথম এ ধরনের রঙিন শোভাযাত্রা বের করেছিল। সেখানে ছিল পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি ও লোকজ উপাদান। চারুকলার শিক্ষার্থী মাহবুব জামাল শামীমসহ কয়েকজন যশোরের এই শোভাযাত্রা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকায় একই ধারা শুরু করেন। ১৯৯০-এর দিকে এর নাম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। শান্তি, মঙ্গল ও অশুভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি একে প্রতিরোধ, ঐক্য এবং সংস্কৃতির শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
অন্যদিকে পহেলা বৈশাখের ইতিহাস আরও পুরোনো। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিভিত্তিক কর ব্যবস্থাকে সহজ করতে বঙ্গাব্দ চালু করা হয়। সেই সময় থেকেই নববর্ষকে ঘিরে হালখাতা, পুণ্যাহ, বৈশাখী মেলা ও লোকজ উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। এগুলো মূলত কৃষি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
কিছু হিন্দু সম্প্রদায় ঘট পূজা, গণেশ পূজা বা চৈত্রসংক্রান্তির আচার থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পরিচিত।
পহেলা বৈশাখ নিজেই আবহমান কালের নয়, এর উৎপত্তি মুঘল যুগে। সম্রাট আকবরের সময় (১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি) ফসলি সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করা হয়। কারণ হিজরি চন্দ্র পঞ্জিকায় কর আদায়ের সময় কৃষকদের সমস্যা হতো। নতুন সৌর পঞ্জিকা চালু করে কর আদায়ের সুবিধা করা হয়।
যেভাবে পালিত হয়ে আসছিল পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী আচার:
- হালখাতা: ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাব বই খুলতেন। পুরনো খাতা বন্ধ করে নতুন খাতা শুরু।
- পুণ্যাহ: জমিদার-মহাজনরা প্রজাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।
- গ্রামীণ উৎসব: লোকসঙ্গীত, বৈশাখী মেলা, হা-ডু-ডু, বলী খেলা ইত্যাদি।
- শহুরে পর্যায়ে: ১৯৬০-এর দশকে ছায়ানটের রমনা বটমূলে প্রাত্যহিক সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরু হয়।
এটি মূলত কৃষি ও প্রশাসনিক উৎসব ছিল
বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বৈশাখ উদযাপন দেশজ সংস্কৃতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এই উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা আবহমান কালের ঐতিহ্য নয়, বরং ১৯৮০-এর দশকের সৃজনশীল প্রতিরোধ। কিন্তু পহেলা বৈশাখ নিজেই মুঘল যুগ থেকে বাঙালির কৃষি-প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। যদিও বর্তমান বাংলাদেশের কৃষকরা এই উৎসব থেকে যোজন যোজন দূরে।
