লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

একজন মা, একটি গোলাপি মশারি ও বেঁচে থাকার লড়াই

প্রকাশিত: 02 অক্টোবর 2026

35 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । প্রতিবেদন ও ছবি : সুমিত আহমেদ সোহেল ।

ঢাকা, কারও কাছে সম্ভাবনার শহর, কারও কাছে শেষ আশ্রয়। জীবিকা, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা একটু ভালো জীবনের আশায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই শহরে আসেন।এ শহর যেমন জীবিকা যোগায় তেমনি নির্দয়। অসংখ্য ভাসমান মানুষ এই শহরে রোদ, বৃষ্টি বন্যায় খোলা আকাশের নিচে বাস করে। নেই জীবন ধরণের জন্য প্রয়োজনীয় নূন্যতম ব্যবস্থা। এই শহর এতটাই নির্দয় হয় যে, সে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক এমনকি নবজাতক শিশুও চিনে না। সে চলে তার আপন গতিতে।

রাজধানীর দোয়েল চত্বর এলাকায় সড়ক সংলগ্ন ঢাকাগেইটের দেয়ালের উপর সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে শুয়ে ছিলেন এক মা। মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই, পাশে নেই নিরাপদ বিছানা কিংবা এতটুকু নিরাপত্তা ব্যাবস্থা। তবু সন্তানকে আগলে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা তাঁর। শিশুটিকে রোদ, ধুলাবালি ও মশার হাত থেকে রক্ষা করতে একটা মশারি, একটা গোলাপী মশারী। দারিদ্র্যের ভেতর মাতৃত্বের এক অসহায় কিন্তু গভীর প্রতিরোধ।

এই দৃশ্য শুধু একজন মায়ের দুর্দশার ছবি নয়; এটি নগরজীবনের বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় সেবার সীমাবদ্ধতা এবং আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। ঢাকা যখন আলোকসজ্জা, উঁচু ভবন ও ব্যস্ত সড়কের শহর হয়ে ওঠে, তখন তার ফুটপাত, সড়ক বিভাজক ও পার্কের কোণে অসংখ্য মানুষ রাত কাটান খোলা আকাশের নিচে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ২০২২–এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাসস্থানহীন বা ভাসমান মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১১৯। তাঁদের মধ্যে ১৬ হাজার ৭৮৪ জন পুরুষ এবং ৫ হাজার ৩৩৫ জন নারী। বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকায় এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৯ হাজার ৪৩৯ জন।

তবে এই সংখ্যা মূলত নির্দিষ্ট সময়ে গণনা করা ভাসমান মানুষের হিসাব। বাস্তবে ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট কিংবা নির্মাণস্থলে অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা আরও বেশি। কারণ অনেক মানুষ এক জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকেন না; কাজের সন্ধানে তাঁরা নিয়মিত স্থান পরিবর্তন করেন।

গ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, ফসলহানি এবং কর্মসংস্থানের সংকট বহু পরিবারকে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় চিকিৎসা, শিক্ষা ও আয়-রোজগারের সীমিত সুযোগ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসী তৈরি হতে পারে।

ঢাকা তাঁদের কাছে শেষ ভরসা, কিন্তু এখানে আসার পর অধিকাংশ মানুষ পান না স্থায়ী বাসস্থান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিশ্চিন্ত কর্মসংস্থান। ফলে তাঁরা শহরের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত হন এবং ফুটপাত, বস্তি বা অস্থায়ী আশ্রয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটান।

সরকারের দায়িত্ব শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা নয়, মানুষের পুনর্বাসন ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা। এ জন্য প্রয়োজন—
• ভাসমান মানুষ ও বাস্তুচ্যুত পরিবারের নির্ভুল তালিকা তৈরি
• সাশ্রয়ী ও নিরাপদ অস্থায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠা
• মা ও নবজাতকের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয়কেন্দ্র
• নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা
• দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ
• জলবায়ু-আক্রান্ত এলাকায় জীবিকা পুনর্গঠন, যাতে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরমুখী না হয়।

পথচারী ও নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে। অসহায় মানুষকে অপমান বা তাড়িয়ে না দিয়ে নিরাপদ সহায়তা দিতে হবে। নবজাতক বা অসুস্থ কাউকে দেখলে নিকটস্থ হাসপাতাল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন কিংবা জরুরি সেবায় যোগাযোগ করা উচিত। সাময়িক দান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সামাজিক চাপ ও জবাবদিহি আরও জরুরি।

গোলাপি মশারির নিচে শুয়ে থাকা শিশুটি শুধু একজন মায়ের সন্তান নয়, সে এই শহরের বিবেকেরও পরীক্ষা। ঢাকা যদি সত্যিই সবার শহর হতে চায়, তবে তার উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষ, বিশেষ করে সবচেয়ে অসহায় শিশুটি, যে কিনা বিনির্মাণ করবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman