এক হাতে ঈদের পোশাকের ব্যাগ, কাঁধে স্ত্রীর নিথর দেহ, আরেক হাতে নিথর শিশু হাসেন, বড় মেয়ে কাঁদছে মায়ের পা জড়িয়ে
দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ডান কাঁধে স্ত্রীর নিথর দেহ। বাম হাতে রক্তাক্ত ছোট্ট সন্তান। পাশে হাঁটছে আরেকটি অবুঝ মেয়ে। আর হাতে ঝুলছে ঈদের নতুন কাপড়ের ব্যাগ। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে ব্যাগে ছিল আনন্দের গন্ধ, সেখানে তখন জমে উঠেছে এক পরিবারের শেষ না হওয়া কান্না।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মানুষ দেখেছে এক অসহায় স্বামীর বুকভাঙা ছুটে চলা। দেখেছে একজন বাবার ভেঙে পড়া পৃথিবী। কেউ লিখেছেন, “এটা কোনো সিনেমা না, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।” কেউ বলেছেন, “ঈদের আগে এমন দৃশ্য কোনো মানুষের জীবনে না আসুক।”
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওর সেই মানুষটির নাম সুজন মিয়া। নরসিংদীর নিম্নআয়ের একটি পরিবার। কখনো ইজিবাইক চালান, কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। তবুও ঈদ মানে তো সন্তানের মুখে একটু হাসি। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২৭ মে স্ত্রী সাথী বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে নরসিংদী শহরে গিয়েছিলেন ঈদের কেনাকাটা করতে।
অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে স্ত্রী আর সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক কিনেছিলেন সুজন। হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, এবার ঈদে ছোট্ট সংসারটায় একটু আনন্দ ফিরবে। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই সব শেষ হয়ে যায়।
রেলস্টেশন পার হওয়ার সময় হঠাৎ ঢাকাগামী ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন সাথী বেগম ও ১৮ মাস বয়সী শিশু সন্তান সাফওয়ান, যাকে পরিবারের সবাই হাসেন বলে ডাকত। দুর্ঘটনার পর মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার আর আতঙ্ক।
রক্তাক্ত স্ত্রীকে কাঁধে তুলে ছুটতে থাকেন সুজন। এক হাতে স্ত্রীকে সামলাতে গিয়ে আরেক হাতে সন্তানকে নিতে পারছিলেন না। তখন স্টেশনের কয়েকজন মানুষ শিশুটিকে তুলে দেন তার হাতে। সেই দৃশ্যই এখন মানুষের বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক দিলীপ চন্দ্র সরকার জানান, দুর্ঘটনার পর সুজন নিজেই আহত স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসক পরীক্ষার পর মা ও শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুজনের একটি বাক্য এখন অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আঘাত করছে। তিনি বলছিলেন, “চোখের সামনে আমার বউ আর বাচ্চা মারা গেল। আগামীকাল ঈদে আমি কী নিয়ে থাকব?”
পরিবার সূত্র জানায়, তাদের ৯ বছর বয়সী আরেকটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা থেকে সে বেঁচে গেলেও, চোখের সামনে মা আর ছোট ভাইকে হারানোর দুঃসহ স্মৃতি হয়তো তাকে সারাজীবন তাড়া করবে।
যে ঘরে ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরে হাসির শব্দ ওঠার কথা ছিল, সেই ঘর এখন নিস্তব্ধ। নতুন জামার ব্যাগটা পড়ে আছে এক কোণে। কিন্তু যার জন্য কেনা হয়েছিল, তারা আর কোনোদিন সেই পোশাক পরবে না।
কোরবানির ঈদ ত্যাগের শিক্ষা দেয়। কিন্তু সুজন মিয়ার জীবনে এবারের ঈদ যেন কেড়ে নিল সবকিছুই। রইল শুধু শূন্যতা, কান্না আর এক বুক না বলা আর্তনাদ।
