লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

আমেরিকা তার বন্ধুদের হারাচ্ছে: ট্রাম্পের ভাইকিং নীতির ভয়াবহ মূল্য

প্রকাশিত: 14 এপ্রিল 2026

15 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা আগ্রাসী নীতি, অন্যদিকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সাধারণ মানুষের শান্তি ও স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা। ট্রাম্প কোনো বিশ্বনেতা তো নয়ই এমনকি কোনো রাষ্ট্র নায়কের মতোও আচরণ করছে না। তার আচরণ অনেকটা জলদস্যুদের মতো হয়ে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালিতে নৌ-বন্ধ ঘোষণা করে ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়, এটি পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জনজীবনের উপর একটি অঘোষিত, অবৈধ ও অমানবিক যুদ্ধ। তিনি ভেবেছিলেন, এভাবে ইরানকে একঘরে করে শায়েস্তা করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ঠিক তার উল্টো। আমেরিকা নিজেই তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

হরমুজ প্রণালির উপর আমেরিকার নৌ-ব্লকেডের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপ। বিশ্বের তেলের প্রায় ২১ শতাংশ এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পরে, যার একটি বড় অংশ যায় ইউরোপের দিকে। ব্লকেডের ফলে তেল ও এলএনজির সরবরাহ ব্যাহত হলে ইউরোপে জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠবে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডসসহ শিল্পনির্ভর দেশগুলোর কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি করবে এবং অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনবে। শীতকালে গ্যাসের অভাবে সাধারণ মানুষের ঘর গরম করা কঠিন হয়ে পড়বে। সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপ যেহেতু রাশিয়ার তেল-গ্যাস থেকে ইতিমধ্যেই বিচ্ছিন্ন, তাই হরমুজ ব্লকেড তাদের জন্য দ্বিতীয় বড় আঘাত হবে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের শিল্প ও জনজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর ইরান যদি বাবল মানদেফ বন্ধ করে দেয় তবে ইউরোপ সম্ভবত তাদের জীবনে কাটানো সবচেয়ে কষ্টকর বছরের দিকে এগিয়ে যাবে।

ইউরোপের দেশগুলো, যারা একসময় আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, তারা এখন খোলাখুলি বলছে, “আমরা জ্বালানি সংকট চাই না, আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।” চীন, রাশিয়া, পাকিস্তানসহ এশিয়ার বড় বড় দেশগুলো ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতিতে স্পষ্ট অসম্মতি জানিয়েছে। এমনকি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও ফাটল ধরতে শুরু করেছে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান এর মতো দেশ যারা একসময় আমেরিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা ছিল এবং নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার উপরই নির্ভরশীল ছিল, তারাও এখন বুঝতে পারছে যে, ট্রাম্পের এই ‘ভাইকিং নীতি’ তাদের নিজেদের অর্থনীতিকেও ধ্বংস করবে। অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত এর কথা আলাদা, তারা এখনো নিজের ভালো নিজে বুঝতে পারছে না।

ট্রাম্প যদি সত্যিই বিশ্বনেতা হতে চান, তাহলে তাঁকে বুঝতে হবে, বিশ্বনেতৃত্বের অর্থ শক্তি প্রদর্শন নয়, দায়িত্বশীল আচরণ। একটি দেশকে পৃথিবীর সবার কাছ থেকে আলাদা করতে গিয়ে তিনি আমেরিকাকেই প্রায় একঘরে করে ফেলছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ইউরোপের তারপর এশিয়ার স্বল্প ও অনুন্নত দেশগুলোর। তেল-গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠবে। মিশরের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সংকট দেখা দেবে। আর সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মতো দেশের কোটি কোটি মানুষ জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়বে। ট্রাম্প এই দেশগুলোকে একটি কৃত্তিম দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে শুধুমাত্র নিজের ক্ষমতা ও অহংকার প্রদর্শনের জন্য।

ট্রাম্পের এই অন্ধ আগ্রাসন শুধু ইরানকে নয়, পুরো বিশ্বকে নিপীড়িত করছে। তিনি ভুলে যাচ্ছেন যে, আজকের বিশ্ব আর এককেন্দ্রিক নয়। চীন, রাশিয়া এবং তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশগুলো এখন আর আমেরিকার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। ইরানের কাছে কাস্পিয়ান সাগর, ইরাক ও পাকিস্তানের স্থলপথ রয়েছে। চীনের সাথে তার দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের ব্লকেড ইরানকে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্থ করবেনা, কারণ তার দেশের বাণিজ্য এর বেশিরভাগটাই চীন ও রাশিয়া কেন্দ্রিক এবং বহু বছর ধরেই নানান আমেরিকান নিষেধাজ্ঞায় সে অভ্যস্থ, কিন্তু আমেরিকান এই কার্যকলাপ ইরানের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করবে আমেরিকার নিজের মিত্রদের।

বিশ্বনেতা হওয়ার অর্থ হলো দায়িত্ববোধ ও বিচক্ষণতা দেখানো, উন্মাদের মতো শক্তি প্রদর্শন বা ভয় দেখানো নয়। যদি ট্রাম্প সত্যিই বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চান, তাহলে তাঁকে এখনই এই অন্ধ আগ্রাসন থেকে সরে আসতে হবে। কারণ তাঁর একের পর এক মূর্খতাপূর্ণ সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হচ্ছে। সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী মানুষ যে আমেরিকানদের ঘৃণা করতে শুরু করেছে তার দায় দায়িত্বও ট্রাম্প ও তার প্রশাসনকেই নিতে হবে।

এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ইসরাইল- মার্কিন জোট ও ইরানের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। নেতানিয়াহুর বিষাক্ত বন্ধুত্ব ট্রাম্পকে পুরো বিশ্বের সাধারণ মানুষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এরই মধ্যে। এই যুদ্ধ কারও একার নয়, এটি এখন সাধারণ মানুষের যুদ্ধ, এটি এখন সাধারণ মানুষের টিকে থাকার যুদ্ধ। আর সাধারণ মানুষ শান্তি চায়, যুদ্ধ নয়। ট্রাম্পের উচিত এখনই বুঝে নেওয়া যে, বিশ্বকে ভয় দেখিয়ে নয়, বিচক্ষণতা ও কূটনীতির মাধ্যমেই নেতৃত্ব দেওয়া যায়। অন্যথায় ইতিহাস তাঁকে শুধু একজন আগ্রাসী নেতা হিসেবেই মনে রাখবে, যার কারণে আমেরিকা বন্ধুদের হারিয়ে একা হয়ে গিয়েছে আর বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছিলেন একদম বিনা কারণেই।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman