দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । বিশেষ প্রতিবেদন ।
প্রতি বছর ১৪ আগস্ট পাকিস্তানজুড়ে স্বাধিনতা দিবস পালিত হয়। ১৯৪৭ সালের এই দিনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল দেশটি। তবে এই অর্জনের পেছনে ছিল বহু বছরের জটিল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। প্রাথমিক লক্ষ্য একক ভারত গঠন হলেও কালক্রমে হিন্দু ও মুসলিম নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক অনাস্থা গভীর রূপ নেয়। ১৯৩০ সালের দিকে মুসলিম সমাজের জন্য পৃথক আবাসভূমির ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে। প্রধানত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া দ্বন্দই পরবর্তীতে দেশভাগের পটভূমি রচনা করে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল বীজ রোপিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতের সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার মধ্যে। ব্রিটিশ ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো নিয়ে পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের ওপর ভারত ত্যাগের প্রবল চাপ তৈরি হয়। ঐসময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম জটিল। একপক্ষে নিখিল ভারত কংগ্রেস অখণ্ড ভারতের দাবিতে অনড় ছিল, অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের দাবিতে দৃঢ় থাকে। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবে প্রথমবারের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তোলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করেন। অবশেষে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ভারত বিভাজন আইন বা ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়। এর ভিত্তিতে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
১৯৪৬ সালের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাকের পর সাম্প্রদায়িক বিভাজন সংঘাতের রূপ নেয়। ক্ষমতা ভাগাভাগির জন্য গঠিত ‘ক্যাবিনেট মিশন’ ব্যর্থ হলে জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে অনড় থাকে, যা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।
দেশভাগের ঘোষণা আসার পর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ রেডক্লিফ কমিশন দ্রুততম সময়ে মানচিত্র কাটছাঁট করায় লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ক্ষমতার শূন্যতা এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক উসকানির কারণে পাঞ্জাব ও বাংলায় ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে নতুন সীমানায় পালিয়ে যাওয়ার সময় ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট মানবীয় ট্র্যাজেডি ও গণহত্যা ঘটে।
দ্বিজাতি তত্ত্বের মূল কথা ছিল, ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলিম দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক ব্যবস্থার অধিকারী জাতি। তারা কেবল ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক নয়, বরং সম্পূর্ণ আলাদা রাজনৈতিক সত্তা।
ঐ সময়ে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ ও সীমানা নির্ধারণ করা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকেই অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছিল। সংখ্যাগুরু হিন্দু অধ্যুষিত নিখিল ভারতে মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য ও রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত রাখা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংঘাত এড়ানোর একমাত্র পথ বলে বিবেচিত হয়।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পৃথক রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মুসলিম লীগের দৃষ্টিতে অত্যন্ত কৌশলগত ও সঠিক ছিল। জিন্নাহ প্রথম জীবনে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূত ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি ও কংগ্রেসের মনোভাব পর্যবেক্ষণ করে তিনি বুঝতে পারেন যে, একটি একক গণতান্ত্রিক ভারতে মুসলিমরা চিরতরে রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু থেকে যাবে। ফলে নিজের জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে পৃথক রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প ছিল না।
পাকিস্তানে ১৪ আগস্ট অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকতার সাথে পালিত হয়। রাজধানী ইসলামাবাদে ৩১ বার এবং প্রাদেশিক রাজধানীগুলোতে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিনের সূচনা হয়।
- মাজার এ কায়েদে (জিন্নাহর সমাধি) বিশেষ গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
- রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ভাষণ এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
- সরকারি ভবনসমূহ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয় এবং সবুজ সবুজ জাতীয় পতাকায় পথঘাট ছেয়ে যায়।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ১ শাওয়াল ১৩৬৬ হিজরি অর্থাৎ রমজান মাসের ২৭ তারিখের পবিত্র রাতে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মাউন্টব্যাটেন ১৪ আগস্ট করাচিতে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সাল থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে ১৪ আগস্টকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপনের রেওয়াজ চালু হয়।
