দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানো এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে চীনের সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার বঙ্গভবনে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।
সাক্ষাতে রোহিঙ্গা সংকটে চীনের ভূমিকার প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান এবং রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য চীনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীন ও বাংলাদেশ চলতি বছরের জুনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল। বেইজিং ওই প্রক্রিয়ায় নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছিল।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির নয় বছর পরও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। সংস্থাটি বলছে, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে বর্তমানে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
সাক্ষাতে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তৈরি পোশাক, বৈদ্যুতিক যান, হালকা প্রকৌশল, উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি ও সৌরশক্তিসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে আরও চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চান তিনি।
আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সম্ভাব্য যোগাযোগব্যবস্থা এবং চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার উদ্যোগকেও স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, এ ধরনের আঞ্চলিক যোগাযোগ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকেও তিনি বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বন্দর আধুনিকায়ন, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্য সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জুনে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সহযোগিতা নথিও স্বাক্ষরিত হয়।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পেও চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতেও চীনের সহযোগিতার প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি। নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সাধারণ হাসপাতাল নির্মাণ ও অর্থায়নের জন্য তিনি চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এর বড় অংশ চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সাধারণ মানুষের জন্য জটিল রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসায় চীনা বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চান রাষ্ট্রপতি। জবাবে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ককে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিতে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফরের কথা স্মরণ করেন। পাশাপাশি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর নিজের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতৃত্ব এবং শিক্ষার্থীদের চীন সফরের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব সফর ও ধারাবাহিক যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময়কার অবদানের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়নে রাষ্ট্রদূতের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুনে দুই দেশের নেতারা নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সাক্ষাতে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব, প্রেস সচিব ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন। চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছিলেন উপপ্রধান দূত ড. লিউ ইউইন।
