দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামো বিভাজনের বিরোধিতায় আন্দোলন করে বিভাগীয় মামলায় দণ্ডিত ২০ কর্মকর্তার লঘুদণ্ড মওকুফ করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির কাছে করা আপিল মঞ্জুরের পর তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া বেতন অবনমনের শাস্তি বাতিল করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত দেন। রোববার এসব প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দণ্ডিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ২০২৫ সালের ২৪ জুন রাজস্ব ভবনের প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে কয়েক দিন আগে জারি হওয়া বদলি আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলা এবং ওই আদেশ অমান্যকারী কর্মকর্তাকে সমর্থন করার। সরকারি নথিতে এ আচরণকে চাকরির শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং সরকারি আদেশ অমান্যের শামিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কর্মকর্তাদের কারও বেতন কয়েক ধাপ কমানো হয়। কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন অবনমনের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা দণ্ডাদেশ মার্জনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করেন। গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে করা এসব আবেদনের পর রাষ্ট্রপতি দণ্ডাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন।
শাস্তি মওকুফ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে উপকমিশনার মো. শাহাদাত জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল বাশার, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া, উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল আলম, কমিশনার জাকির হোসেন, যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির, অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু, অতিরিক্ত কমিশনার আ আ ম আমীমুল ইহসান, অতিরিক্ত কমিশনার সিফাত-ই-মরিয়ম ও অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহাম্মদ তারেক রিকবদার রয়েছেন।
এ ছাড়া উপকর কমিশনার নো. জিল্লুর রহমান, উপকর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল, অতিরিক্ত কর কমিশনার মির্জা আশিক রানা, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, যুগ্ম কর কমিশনার মামুন মিয়া, অতিরিক্ত কর কমিশনার মিজ চাঁদ সুলতানা, অতিরিক্ত কর কমিশনার সুলতানা হাবীব, অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ, যুগ্ম কর কমিশনার মিজ মাসুমা খাতুন ও যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীনও রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক কাঠামোয় ভাগ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। প্রস্তাবিত কাঠামোর বিরুদ্ধে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু করেন। এপ্রিলের শেষ দিকে শত শত কর্মকর্তা রাজধানীর রাজস্ব ভবনে বিক্ষোভ করেন। মে মাসে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি আরও জোরালো হয়।
পরিস্থিতি জুনে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২৮ জুন কর্মকর্তারা দেশব্যাপী পূর্ণ কর্মবিরতি শুরু করলে শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর সংক্রান্ত কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। পরে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতা ও সরকারের চাপের মুখে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।
আন্দোলনের পর কয়েক দফায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত, বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর ও লঘুদণ্ডের মতো ব্যবস্থা ছিল। আগস্ট ২০২৫ সালেও আন্দোলনে সাংগঠনিক ভূমিকার অভিযোগে চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
চলতি বছরের ১৮ আগস্ট রাজস্ব সম্মেলনে কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন করেন। এরপর রাষ্ট্রপতির আপিল মঞ্জুরের ভিত্তিতে ২০ কর্মকর্তার দণ্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত এলো।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলা এনবিআর সংস্কার ও কর্মকর্তাদের আন্দোলন ঘিরে প্রশাসনিক বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
