লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

আবু গারিবের অন্ধকার কুঠুরি, যেখানে মনুষত্বকে হত্যা করা হয়েছে

প্রকাশিত: 20 নভেম্বর 2025

20 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।

২০০৩ সালের এপ্রিলে আমেরিকার হাতে বাগদাদ পতনের পর আমেরিকান সেনারা আবু গারিব কারাগারকে বন্দি শিবিরে পরিণত করে। একসময় সাদ্দামের হোসাইনের জেলখানা ছিল এটা, কিন্তু ২০০৩-২০০৪ সালে এখানে যা ঘটেছে, তা মানবতার ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে। ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামের প্রতি ভয় ছড়ানোর কাজটি বেশ জোড়ে শোরেই শুরু হয়।

বন্দিরা বলতেন, তাদের প্রথমেই উলঙ্গ করে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। হাত-পা বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো পিরামিডের মতো একজনের ওপর আরেকজনকে চাপিয়ে রাখা হতো। কুকুর দিয়ে ভয় দেখানো হতো, কখনো ছেঁকে ধরত। এক বন্দি, নাম হাইদার সাবের আবুদ, পরে বলেছিলেন, “ওরা আমাদের মাথায় মহিলাদের অন্তর্বাস চাপিয়ে দিত, তারপর কুকুর নিয়ে আসত। কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করছে, আমরা চিৎকার করছি, কিন্তু কেউ শুনছে না।”

আরেক বন্দি আমের কাশেম বলেছিলেন, “ওরা আমাদের হাত-পা বেঁধে বিদ্যুৎ সংযোগ দিত। শরীরে ঝাঁকুনি লাগত, মনে হতো মরে যাব। কখনো পানির পাইপ দিয়ে পেটাত, কখনো মাটিতে শুইয়ে আমাদের ওপর দিয়ে হেঁটে যেত।” অনেককে প্লাস্টিকের ব্যাগ মাথায় চাপিয়ে দিয়ে শ্বাসরোধ করা হতো। কখনো যৌন নির্যাতন। পুরুষ বন্দিদের জোর করে একে অপরের সঙ্গে অস্বাভাবিক কাজ করতে বাধ্য করা হতো, ছবি তোলা হতো। মহিলা বন্দিদেরও উলঙ্গ করে ছবি তোলা হতো, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হতো।

এক তরুণ বন্দি, নাম আলি শাইয়া, পরে বলেছিলেন, “আমাকে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে বলল, তোর মা-বোনকে এখানে আনব। তারপর ওরা আমাকে উলঙ্গ করে হাতকড়া লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখল। দুই দিন খাবার দেয়নি। আমি চিৎকার করলে ওরা হাসত।”

কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন জেনিস কর্পিনস্কি, ৮০০তম মিলিটারি পুলিশ ব্রিগেডের কমান্ডার। তিনি পরে বলেছিলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল এরা সন্ত্রাসী, তথ্য বের করতে যা খুশি করতে পারি। উপর থেকে চাপ ছিল।” কিন্তু সেই ‘উপর’ কারা? ডোনাল্ড রামসফেল্ডের নেতৃত্বাধীন পেন্টাগন থেকে ‘এনহ্যান্সড ইন্টারোগেশন টেকনিক’ অনুমোদন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল স্ট্রেস পজিশন, ঘুমতে না দেওয়া, কুকুর দিয়ে ভয় দেখানো।

কারারক্ষী চার্লস গ্রেইনার, যার ছবি বিশ্ব দেখেছে, পরে আদালতে বলেছিলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এটা নিয়মের মধ্যে। ওরা বলেছিল, এরা তালেবান, আল-কায়েদা। ওদের ভাঙতে হবে।” আরেক রক্ষী লিন্ডি ইংল্যান্ড, যে ছবিতে এক বন্দিকে দড়ি বেঁধে টানছে, সে বলেছিল, “আমরা মজা করছিলাম। ওরা যখন কাঁদত, আমরা হাসতাম।”

২০০৪ সালের এপ্রিলে সেই ছবিগুলো যখন সিবিএস নিউজে প্রকাশ পেল, পুরো দুনিয়া কেঁপে উঠল। নগ্ন বন্দিদের পিরামিড, কুকুরের সামনে ভয়ে কাঁপতে থাকা মানুষ, অসহায় বন্দীদের সাথে তামাশা করে হাসতে হাসতে ক্যামেরায় পোজ দেয়া সেনারা। আমেরিকান সরকার প্রথমে অস্বীকার করল, পরে বলল ‘কয়েকজনের কাজ’ বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মাত্র ১১ জন সেনা শাস্তি পেল, সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর। কিন্তু যারা নির্দেশ দিয়েছিল, তারা কেউ বিচারের মুখোমুখী হয়নি।

আবু গারিবের বন্দিরা আজও সেই দুঃস্বপ্নে জেগে ওঠেন। কেউ শরীরে দাগ নিয়ে বেঁচে আছেন, কারো মনের ক্ষত এখনো বেশ গভীর। আর আমেরিকা যে ‘মানবাধিকারের পতাকা’ বহন করে, সেই দাবি চিরদিনের জন্য কলঙ্কিত হয়ে গেছে আবু গারিবের অন্ধকার কুঠুরিতে।

 

 

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman