ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতায় স্বৈরশাসকদের গল্প ঘৃণা, লজ্জা আর পরাজয়ের। তারা ক্ষমতায় এসে জনগণকে স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু নির্যাতন, দমন আর লোভের জালে আটকে নিজেদের সিংহাসন গড়েন। শেষে? জনরোষের ঝড়ে উড়ে যান, তার দল ছিন্নভিন্ন হয়, আর দেশটা রক্তাক্ত অস্থিরতায় পড়ে।
আজ যখন বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে দেশ এক নতুন সমীকরণের দিকে, তখন ইতিহাস ফিরে তাকিয়ে বলছে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা স্বৈরশাসকদের চিরন্তন পরিণতি। কিন্তু হাসিনার গল্প কোথায় শেষ হবে? তার ফিরে আসা বা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ কতটা? আর তার অনুসারীরা কী করবে?
ইতিহাস স্বৈরশাসকদের পতনের একই নকশা আঁকে। অ্যাডলফ হিটলার, নাজি জার্মানির শাসক, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত ইউরোপকে রক্তাক্ত করলেন। তার নাজি পার্টি লক্ষ মানুষের গণহত্যায় হাত লাল করল, কিন্তু ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত সেনারা বার্লিন দখল করলে হিটলার আত্মহত্যা করলেন। তার দল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নেতারা ফাঁসিতে ঝুললেন।
বেনিতো মুসোলিনি, ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা, ২১ বছর শাসন করলেন। কিন্তু ১৯৪৫ সালে জনরোষে পড়ে গেলেন। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় গেরিলাদের হাতে ধরা পড়ে উল্টো করে ঝুলিয়ে গুলি করে মারা হল। তার ফ্যাসিস্ট দলের অবশেষাংশও উড়ে গেল।
নিকোলাই চাউশেস্কু, রোমানিয়ার কমিউনিস্ট শাসক, ২৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮৯ সালে জনআন্দোলনে পড়ে গেলেন। স্ত্রী সঙ্গে পালিয়ে গেলেন, কিন্তু ধরা পড়ে সামরিক বিচারে গুলি করে তার হত্যা নিশ্চিত করা হয়। তার কমিউনিস্ট পার্টি নিশ্চিহ্ন। এছাড়াও একেবারে এই সময়ে শ্রীলংকা, নেপাল ফাসসিসম পতনের এবং পরিণতির জ্বলন্ত উদাহরণ।
এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট, স্বৈরশাসকরা একা বিপদে পরে না, ধ্বংস হয় তার অনুসারীরা, তাকে অন্ধভাবে ভালোবেসে ফেলা কিছু নিরীহ মানুষ এবং সর্বোপরি তার দলও ধ্বংস হয়। জনরোষকে দমানোর মতো কোনো দেওয়াল ইতিহাসে এখনো তৈরী হয়নি অবশ্য কিছু সময় থামিয়ে রাখা যায় মাত্র। নির্যাতন, দুর্নীতি, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও দমন এসবই পতনের বীজ। হিটলারের হলোকাস্টে ৬০ লক্ষ ইহুদি নিহত, চাউশেস্কুর শাসনে লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হলেন। তারপর জনগণের ধৈর্যচ্যুতি সব শেষ করে দিলো।
এখন শেখ হাসিনার গল্প। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১৫ বছরের শাসন। নির্বাচনী জালিয়াতি (২০১৮, ২০২৪), বিরোধী মতের মানুষদের নিয়মিত কারারুদ্ধ করা , মিডিয়া দমন ও নিয়ন্ত্রণ, যে কোনো ন্যায্য আন্দলোকে দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যাপক বল প্রয়োগ করে দমন ও রক্তপাত করা। নিজেকে জনতার সামনে ভিকটিম সাজিয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা। দেশের প্রায় প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পকে অতিরিক্ত মূল্যমান দেখিয়ে ব্যাপক টাকা লুট ও দেশের বাইরে পাচার করা। বিরোধী মত দমনে হাজার হাজার গায়েবী মামলা এমনকি মৃত লোকের নামেও মামলা করতে ভাবেনি। রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে ব্যাক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে খুনে বাহিনীতে পরিণত করা। যারা অসংখ্য গুম, খুন ও নিপীড়ন চালিয়ে হাসিনার জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতা নিরাপদ করছিলো। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ৫ আগস্ট হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, অনেক নেতা গ্রেপ্তার।
১৭ নভেম্বর ২০২৫-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনা ও তার অপরাদের মূলহোতাদের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ: ছাত্র আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ, ড্রোন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে -হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে হত্যা করার আদেশ দেওয়া। সম্পদ বাজেয়াপ্ত, শহীদদের ক্ষতিপূরণের নির্দেশ। রায় টিভিতে সম্প্রচারিত হয়, রায় ঘোষণার পর দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, হয় মিষ্টি বিতরণ।
হাসিনার ফিরে আসা বা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ নেই। জনরোষে হাসিনা একই পালায়নি, পালিয়েছে তার মন্ত্রিসভার প্রায় সকলে, বিভিন্ন স্তরের দলীয় অনেক নেতা, পুলিশের লোক, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোক এমনকি জাতীয় মসজিদ ও মন্দিরের ইমাম ও পুরোহিত। যা পুরা বিশ্বেই নজির বিহীন ঘটনা। হাসিনা ভারত থেকে হাসিনা ফোন এবং অনলাইন ব্যাবহার নানান রকম উস্কানি মূলক নির্দেশনা দিয়ে দল নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন, যা তার এবং তার লুকিয়ে থাকা অনুসারীদের জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল ও কঠিন করে তুলছে। সম্প্রতি তার উস্কানিতে বাসে আগুন দিয়ে একজন বাস চালককে হত্যা করা হয়েছে, অন্য আরেকটি ঘটনায় তিন ছাত্রকে টাকার লোভ দেখিয়ে বাসে আগুন দিতে পাঠালে জনতার প্রতিরোধের মুখে একজন নদীতে লাফিয়ে পরে মারা যায় একজন ধরা পরে ও আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এতে দেশব্যাপী পুনরায় গণরোষ তৈরী হয়। তার এমন কাজ কর্ম তার দেশে ও ক্ষমতায় ফেরা অসম্ভব করে তুলেছে, এছাড়াও তাঁর মৃত্যুদন্ডের রায়, তার দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সহ রয়েছে নানান আইনি জটিলতা।
হাসিনার অনুসারীদের কী করা উচিত? ইতিহাস বলে, স্বৈরশাসকের দলের লোকেরা যদি জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তারা নতুন করে আবার সব শুরু করতে পারে, মানুষ ধীরে ধীরে তাদের ক্ষমা করে দিতে থাকে। চাউশেস্কুর সমর্থকরা রোমানিয়ায় ডেমোক্র্যাটিকপার্টিতে যোগ দিয়ে রিইনভেন্ট করেছে। হাসিনার অনুসারীরা আওয়ামী লীগের অতীত ছেড়ে দিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে পারে বা জনরোষ শান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরণের রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পার। ভোটের মাধ্যমে নিজের অনুকূল হতে পারে এমন সরকার নির্বাচন করতে পারে, ঐক্য করে নির্বাচনে অংশ নিন। জুলাই বিপ্লবের শিক্ষা নিন: জনগণের ঐক্যই সব। অন্যথায়, তারা হাসিনার মতো একা হয়ে পড়বে।

লেখকঃ
খন্দকার আজিজুর রহমান (এ আর সুমন)
হেড অব ফোটোগ্রাফি
দ্য ডেইলি অবজার্ভার
