দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসস্তূপ আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে যায়নি গাজার মানুষের। বিদ্যুৎ সংকট, নিরাপত্তাহীনতা ও সীমিত সুযোগের মধ্যেও ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির, অস্থায়ী ক্যাফে ও খোলা জায়গায় জড়ো হচ্ছেন হাজারো ফুটবলপ্রেমী।
মধ্য গাজার নুসেইরাত এলাকার একটি বাজারে সম্প্রতি বেলজিয়াম ও মিসরের ম্যাচ ঘিরে তৈরি হয়েছিল উৎসবের পরিবেশ। চারপাশে অন্ধকার থাকলেও একটি বড় পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাচ উপভোগ করেন স্থানীয়রা। মিসরের তারকা ফুটবলার মোহাম্মদ সালাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে ম্যাচটি নিয়ে আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হলেও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ঘাটতি ছিল না।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা মুস্তাফা সিয়াম বলেন, গাজার মানুষের জন্য বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া আসর নয়। এটি কিছু সময়ের জন্য যুদ্ধ ও কষ্টের বাস্তবতা ভুলে থাকার একটি সুযোগ।
যুদ্ধের আগে বড় টুর্নামেন্টগুলোকে ঘিরে গাজায় যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো, এখন তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবুও বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী ক্যাফে ও শরণার্থী শিবিরে টেলিভিশন বসিয়ে ম্যাচ দেখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মধ্য গাজার আল-জাওয়াইদা এলাকার একটি বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে ছোট একটি টেলিভিশনের সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে খেলা দেখছেন দর্শকেরা। পাশে চলছে পুরোনো জেনারেটর।
স্থানীয় বাসিন্দা ঈদ আল-আত্তার বলেন, বিশ্বকাপকে ঘিরে আনন্দ করার চেষ্টা করলেও স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। তাঁর মতে, বিশ্বের অধিকাংশ ফুটবলপ্রেমীর মতো গাজার মানুষও একদিন বিশ্বকাপ সরাসরি উপভোগ করতে চান, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেটি প্রায় অসম্ভব।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন সরাসরি দেখার সুযোগ সীমিত।
গাজা সিটির বাসিন্দা মাজেন আল-ঘুল বলেন, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে বিশ্বের মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে, অথচ গাজার মানুষ এখনো ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার সংকটে ভুগছে।
অনেকেই স্মরণ করছেন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কথা। সে সময় গাজার বিভিন্ন স্টেডিয়ামে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছিল। হাজারো মানুষ একসঙ্গে বসে ম্যাচ উপভোগ করেছিলেন। বর্তমানে সেই সুযোগ আর নেই। যুদ্ধের কারণে বহু রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও আড্ডাকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ফুটবল থেমে নেই। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় সমুদ্রতীরবর্তী বালুচরে তরুণদের নিয়ে নিয়মিত ফুটবল প্রশিক্ষণ চলছে। অনেকেই খালি পায়ে কিংবা পুরোনো জুতা পরে খেলছেন। দর্শকেরাও ভাঙা কংক্রিটের স্তূপে বসে খেলা উপভোগ করছেন।
স্থানীয় কোচ মোহাম্মদ আবু তাহর বলেন, ফুটবল এখনো তরুণদের জন্য আশা ও মুক্তির প্রতীক। আরেক কোচ জাবের আল-বাসিতি বলেন, ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তাদের নিজস্ব বিশ্বকাপ চলছে।
যুদ্ধ গাজার মানুষের জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু ফুটবলের প্রতি আবেগ, স্বপ্ন এবং বিশ্বকাপের উন্মাদনা এখনো অটুট রয়েছে। অন্ধকার, ধ্বংস আর দুর্ভোগের মাঝেও ফুটবল গাজার মানুষের কাছে আশার এক টুকরো আলো হয়ে আছে।
সূত্র: প্রথম আলো
