দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । প্রফেসর ড. আসিফ মিজান ।
ইতিহাসের বয়ানে কিছু তারিখ কেবল পঞ্জিকার পাতা বদলায় না। বরং জাতির সম্মিলিত বিবেককে নাড়িয়ে দেয় এবং রাজনৈতিক গতিপথকে চিরতরে পরিবর্তন করে। ২০০৭ সালের ৭ মার্চের অন্ধকার ঘণ্টাগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এমনই একটি করুণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। কোনো বৈধ ওয়ারেন্ট, আইনি অভিযোগ বা যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব জনাব তারেক
রহমানকে তার বাসভবন থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। একে সাধারণ গ্রেপ্তার হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান ও শাসন ব্যবস্থার বিশ্লেষণে এটি ছিল গভীরমুখী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। রাজনৈতিক বিজ্ঞানে একে বলা হয় রাজনৈতিক নিপীড়ন। এটি ছিল দেশের বৃহত্তম জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নেতৃত্বহীন করে দেওয়ার এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূ রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে খর্ব করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে তাঁর অবিচল অবস্থানের জন্য জনাব তারেক রহমান ৫৫৪ দিন কারাবরণ করেছিলেন। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৫, ৯ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে রিমান্ডের নামে তাঁর ওপর চালানো হয় নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অপরাধবিজ্ঞানে এটি রাষ্ট্রীয় অপরাধের একটি পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ যেখানে আইনের রক্ষকরাই অপরাধীতে পরিণত হয়েছিল। এই শারীরিক নির্যাতনের সমান্তরালে মূলধারার গণমাধ্যম জুড়ে তাঁর জনসম্মুখের ঐতিহ্য মুছে ফেলতে রাষ্ট্রপোষিত চরিত্র হননের অভিযান চালানো হয়। তবু ইতিহাস আমাদের শেখায় যে প্রচারণা কখনোই সত্যকে স্থায়ীভাবে অন্ধকারে ঢেকে রাখতে পারে না। এই সব কুচক্র তাঁর সংকল্প, দেশপ্রেম বা লৌহদৃঢ়তাকে ভাঙতে পারেনি।
কারাগারের আগুন এবং পিজি হাসপাতালে যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার মধ্য দিয়ে গিয়ে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জনাব তারেক রহমান ১২টি মিথ্যা মামলায় জামিন পান। জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন ও প্রতিরোধের জোয়ারেই এটি সম্ভব হয়েছিল। গত দেড় দশকের বেশি সময় নির্বাসন থেকে কাজ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার ও কৌশলগত প্রজ্ঞার মাধ্যমে বিরোধীদলকে সংগঠিত করার তাঁর পদ্ধতি আধুনিক রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তোনিও গ্রামসির রাজনৈতিক আধিপত্যের ধারণাকে উপেক্ষা করে তিনি জনমনকে একত্রিত করেছিলেন। তাঁর ধৈর্য, সততা ও নেতৃত্ব ম্যাক্স ওয়েবারের ক্যারিশমেটিক কর্তৃত্ব তত্ত্বের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃত নেতারা সংকটে ম্লান হন না। বরং তারা ফিনিক্সের মতো ছাই থেকে উঠে দাঁড়ান।
আজ গোপন নকশা ভেঙে এবং জনগণের হৃদয় জয় করে তিনি একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব গণতান্ত্রিক জাগরণ পরিলক্ষিত হয়। জনগণ তাদের ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে অভূতপূর্ব দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপির গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন আইনের শাসন ও সুশাসনের নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘ বছরের স্বৈরশাসনের পর জনগণের ইচ্ছার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বাস্তবায়ন এটি।
এই ঐতিহাসিক মাইলফলকে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্তরের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তাঁর ত্যাগ, ধৈর্য ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন সকালে পা রাখছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ভয় ও বৈষম্যহীন একটি সার্বভৌম, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এটি যাত্রা।
লেখক: অপরাধবিজ্ঞান, শাসন ব্যবস্থা ও মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ,
বর্তমানে তিনি সোমালিয়ার দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
