দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
রাজধানীর সড়কে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী কোনো যানবাহন দেখা গেলেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। একই সঙ্গে কালো ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, গত জুলাই মাসে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ৯১৫টি মামলা করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এসব যানবাহনের বেশিরভাগই ছিল বাস ও পণ্যবাহী আচ্ছাদিত যান।
ট্রাফিক পুলিশের এই উদ্যোগের পেছনে রাজধানীর দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর এক লাখ ৫৯ হাজারের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু এবং প্রায় ২৫০ কোটি দিন অসুস্থতায় কাটে। ঢাকায় সূক্ষ্ম বস্তুকণার বার্ষিক গড় মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমার তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বেশি।
আনিছুর রহমান বলেন, রাজধানীতে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন নিয়মিত চলাচল করছে। তবে যানবাহনের যান্ত্রিক মান বা ফিটনেস নিশ্চিত করা ট্রাফিক পুলিশের মূল দায়িত্ব নয়। যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের। ট্রাফিক পুলিশ মূলত সড়ক চলাচলের আইন লঙ্ঘন হলে ব্যবস্থা নেয়।
তিনি বলেন, সাধারণত ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে পারে। নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের কারণেও ইঞ্জিন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অতিরিক্ত ধোঁয়া তৈরি করতে পারে। ফলে শুধু চালককে জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, ফিটনেস পরীক্ষা, জ্বালানির মান এবং আইন প্রয়োগের পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কার্যকর করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও বাংলাদেশের পরিবহন খাতে পুরোনো যানবাহন, ডিজেলনির্ভরতা, পর্যাপ্ত নির্গমন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাব এবং দুর্বল যানবাহন পরিদর্শন ব্যবস্থাকে বায়ুদূষণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৩৭ হাজার থেকে বেড়ে ৬০ লাখের বেশি হয়েছে।
বর্তমানে যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশে নতুন পরিদর্শনকেন্দ্র স্থাপন এবং ভ্রাম্যমাণ নির্গমন পরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত পরিচ্ছন্ন বায়ু প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি নতুন যানবাহন পরিদর্শনকেন্দ্র নির্মাণ, দুটি কেন্দ্র উন্নত করা এবং ২০টি ভ্রাম্যমাণ নির্গমন পরীক্ষা ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের দূষণকারী নির্গমন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সময়ে যৌথ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অভিযানের সময় অনেক কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন রাস্তায় চলাচল বন্ধ করে অন্যত্র অবস্থান নেয়। অভিযান শেষ হলে আবার সড়কে ফিরে আসে। পুলিশের পক্ষে প্রতিদিন প্রতিটি যানবাহন পরীক্ষা করা সম্ভব নয় বলেও তিনি জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করার পরও সেটিকে আবার কালো ধোঁয়া ছড়াতে দেখা গেলে একই অপরাধে বেশি জরিমানার বিধান প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে শুধু মামলা ও জরিমানা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যানবাহনের মালিক, চালক, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কালো ধোঁয়ার পাশাপাশি রাজধানীতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণেও অভিযান চলছে। নীরব এলাকা নির্ধারণ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলেও অনেক চালক তা মানছেন না বলে জানান আনিছুর রহমান। অতিরিক্ত হর্নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে ঘটনার প্রমাণ নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে, যা কোন যানবাহন অপ্রয়োজনীয়ভাবে হর্ন বাজিয়েছে তা শনাক্ত করতে সক্ষম। তবে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অর্থায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যানবাহন থেকে নির্গত দূষণ মানুষের হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে ডিজেলচালিত যানবাহনের ধোঁয়ায় ক্ষতিকর সূক্ষ্ম কণার উপস্থিতি বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, ঢাকার বায়ুদূষণ মোকাবিলায় শুধু রাস্তায় অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, নির্গমন পরীক্ষা, উন্নত গণপরিবহন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার একসঙ্গে নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও ঢাকার যানবাহনজনিত দূষণ কমাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
