লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

‘আমাকে গুলি করো, শুধু আমার ছেলেকে বাঁচতে দাও’: ফিলিস্তিনি শিশু আহমাদ যায়েদের শেষ মুহূর্ত

প্রকাশিত: 09 জুলাই 2026

5 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । আলজাজিরা বিশেষ প্রতিবেদনের অনুবাদ । লেখিকা: লায়লা ওয়ারাহ ।

তিন মাস বয়সী এক শিশুর জন্মসনদ ও মৃত্যুসনদ একই দিনে ইস্যু হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের এক চেকপয়েন্টে অ্যাম্বুলেন্সে পৌঁছাতে বাধা দেয় তার পরিবারকে।

দেইর আম্মার শরণার্থী শিবির, অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, রবিবার সকালটা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ কিন্তু আনন্দের মুহূর্ত দিয়ে। তিন মাস বয়সী আহমাদ যায়েদ সেদিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দুধ খেয়েছিল। তার বাবা মারুফ যায়েদ রামাল্লাহ থেকে ছেলের জন্মসনদ সংগ্রহ করে এসেছিলেন। পরিবারটি আহমাদের প্রথম বাইরের ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, পরের দিন জেরিকোতে বোন ও চাচাতো ভাইবোনদের সাথে দিন কাটানোর পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু বিকেলের মধ্যেই সেই আনন্দের মুহূর্তগুলো পরিণত হয়েছিল প্রাণ বাঁচানোর হৃদয়বিদারক দৌড়ে। মা ইয়াসমিন যায়েদ হঠাৎ দেখেন তার ছেলে অচেতন হয়ে পড়েছে। তিনি তাকে দ্রুত কাছাকাছি মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেন এবং রামাল্লাহর হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়।

কিন্তু দেইর আম্মার ও রামাল্লাহর মাঝের রাস্তায় ইসরায়েলি বাহিনীর একটি তালাবদ্ধ গেট অ্যাম্বুলেন্সের পথ আটকে দেয়। পরিকল্পনা ছিল — শিশুকে গেট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, তারপর চিকিৎসকরা অক্সিজেন মাস্কসহ তাকে কোলে করে কয়েক পা দূরে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেবেন।

কিন্তু সেখানে ইসরায়েলি সেনারা দাঁড়িয়ে ছিল। মারুফ যায়েদ, যিনি তখন রামাল্লাহ থেকে ফিরছিলেন, মরিয়া হয়ে সেনাদের কাছে আকুতি জানান — তার মৃত্যুপথযাত্রী শিশুকে যেন পার হয়ে যেতে দেয়। কিন্তু তারা গেট খুলতে অস্বীকার করে এবং পরিবারকে পায়ে হেঁটে পার হতে বাধা দেয়। তাদের চিৎকার করে বলা হয়, “পিছনে সরে যাও!”

মারুফের ভাবী ফাতিমা আল-আবদ খলিল আল জাজিরাকে বলেন, “তারা খুব রেগে গিয়ে বলছিল, আমাদের গুলি করে মারবে। ছেলেটিকে দেখে একটু থমকে যায়, তারপর আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে।”
নিজের ছেলেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় মারুফ আহমাদকে কোলে নিয়ে সেনাদের দিকে এগিয়ে যান। অক্সিজেন মাস্ক খুলে পড়ছিল। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার ছেলে মারা যাচ্ছে। আমাকে গুলি করো, শুধু আমার ছেলেকে পার হয়ে যেতে দাও।”

সেনারা জবাবে টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছোড়ে। পরিবারকে গাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। অনেক ঘুরপথে, ধুলো-মাটির রাস্তা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে পৌঁছাতে হয়। বিকেল ৩:২০ মিনিটে যখন আহমাদকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের পথেই তার মৃত্যু হয়। যেদিন তার বাবা জন্মসনদ নিয়ে এসেছিলেন, সেদিনই তাকে মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করতে হয়।

এটি প্রথম নয়, শেষও নয়, স্থানীয়রা বলছেন, ফেব্রুয়ারির শেষে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই সামরিক গেটটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ১৮,০০০ মানুষ তিনটি গ্রাম থেকে রামাল্লাহর মূল সড়ক ও সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

আহমাদের মা ইয়াসমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “অন্তত যখন কেউ অসুস্থ হয়, যখন কেউ মৃত্যুর দুয়ারে, তখন তো গেটটা খুলে দাও।” ফাতিমা বলেন, “এটি প্রথম ঘটনা নয়, শেষও নয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো রোগী হাসপাতালে যেতে চায়। এটাই আমাদের জীবন।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে শুধু ওয়েস্ট ব্যাঙ্কেই স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সের ওপর ২৩৩টি ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই ছিল চলাচলে বাধা দেওয়া।

আহমাদের মৃত্যুর পরও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তার দাফন নিয়ে নির্দেশনা দেয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগান, শহীদের পোস্টার বা জনসমক্ষে কোনো প্রদর্শনী চলবে না। শুধু তার কফিনে একটি পতাকা ছিল।

আহমাদ তার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ছিল। তিন কন্যার পর নয় বছর চেষ্টার পর তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। তার মা তিনবার ব্যর্থ ফার্টিলিটি ট্রিটমেন্টের পর তাকে পেয়েছিলেন।

তার খালা সেনিয়োরা যায়েদ আহমাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমরা সবাই এখন পাগল হয়ে যাচ্ছি। সে আমাকে বলছে — আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আসতে চাই। আমি তাকে কবর থেকে ফিরিয়ে আনতে চাই।”

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman