দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
রাজধানীর মিরপুরে জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে একাধিক অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী এসব চক্রের কয়েকটির নিয়ন্ত্রক বিদেশে অবস্থান করলেও তাদের সহযোগীরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।
মিরপুরের পল্লবী, মিরপুর ১২, সাগুফতা ও বাউনিয়া এলাকায় মফিজুর রহমান মামুনের নেতৃত্বাধীন একটি চক্রের তৎপরতার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে অবস্থান করেও তিনি স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে জমি দখল, চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর দুই ভাই জামিল রহমান ও মশিউর রহমান দেশে থেকে ওই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় যুক্ত বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ রয়েছে। তবে মশিউর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পুলিশের বিভিন্ন তালিকা ও তদন্তে মিরপুরে একাধিক অপরাধী গোষ্ঠীর অস্তিত্বের তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে প্রভাবের এলাকা ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। এর ফলে জমি, বাজার, পোশাক কারখানা, পরিবহন ও বিভিন্ন ব্যবসা ঘিরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
জমি দখলের অভিযোগের একটি উদাহরণ পল্লবীর বাইগারটেক এলাকায়। আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর দাবি, তাঁর প্রায় ২৮ কাঠা জমির সীমানাপ্রাচীর ও টিনের ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে জমিটি দখলে নেওয়া হয়েছে। জমিটির মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, মামুনের ভাই মশিউর তাঁকে জমিতে যেতে নিষেধ করেছেন।
শুধু জমি নয়, মিরপুরের পোশাক কারখানাগুলোও চাঁদাবাজির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় সূত্রের হিসাবে মামুনের প্রভাবাধীন এলাকায় শতাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে মাসে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিভিন্ন সময় বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
মিরপুরের অপরাধ পরিস্থিতির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও উঠে এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগ থাকলেও এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির দায় ও সংগঠনের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও বলেছেন, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুরের অপরাধ পরিস্থিতি যে গুরুতর তা সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাতেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। র্যাব ২০২৬ সালের মার্চে ওই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে দুই শুটারকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি মিরপুরে কিশোর অপরাধী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার অভিযোগও রয়েছে। পল্লবী এলাকায় একাধিক কিশোর গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে মামুনের ভাই মশিউরের বিরোধের কথাও স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মিরপুরে অপরাধ দমনে অভিযান চালানোর তথ্যও রয়েছে। চলতি বছরের জুনে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগকে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনায় শ্রেষ্ঠ অপরাধ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পল্লবী থানাও ওই সময়ে থানাগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান পায়।
মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অপরাধী চক্রের প্রভাব কমাতে শুধু গ্রেপ্তার নয় বরং জমি দখল, চাঁদাবাজি ও অবৈধ ব্যবসার অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপরাধী চক্রের বিস্তার শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যবসায়ী বা জমির মালিকদের নয়, পুরো এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সূত্রঃ প্রথম আলো
