লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

একসঙ্গে দেশজুড়ে অস্থিরতা কেন? এর পেছনের বাস্তবতাই বা কি ?

প্রকাশিত: 02 নভেম্বর 2026

1 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

বাংলাদেশে এখন শুধু একটি নয়, একসঙ্গে কয়েকটি সংকট সামনে এসেছে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের রক্তাক্ত বিক্ষোভ, পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটন-অবরোধ আর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা। এগুলো কি শুধুই তাৎক্ষণিক ঘটনা? নাকি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এসব ঘটনায় কি বিদেশী মদদ আছে? তবে “সব বিশৃঙ্খলার পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র” বলার আগে প্রমাণ, তদন্ত ও দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ দরকার।

গত কয়েকদিনে ঢাকার মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে হাজারো পোশাকশিল্প শ্রমিক রাস্তায় নেমেছেন। তাঁরা সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। বিক্ষোভের মধ্যে তারা পুলিশের ওপর ইট-পাথর নিক্ষেপ, রাস্তা অবরোধ এবং পুলিশের যানবাহন ও ফাঁড়িতে আগুন পর্যন্ত ধরিয়ে দিয়েছে। পুলিশ টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করেছে।

এই সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি বাজারের অনুভূত অন্যায্যতা। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে মজুরি বাড়েনি, ফলে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। যখন একটি শ্রেণি দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও ন্যায্য বেতন, বকেয়া পরিশোধ, চাকরির নিরাপত্তা ও জীবন যাপনের ন্যায্য অধিকার পায় না, তখন ক্ষোভ সহজেই সহিংস রূপ নেয়। আশুলিয়ার বিক্ষোভে বেতনের পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্তি ও চাকরির নিরাপত্তার অভিযোগও উঠেছে।

এই প্রশ্নও উঠেছে এতো পদ্ধতিগত ভাবে সবাইকে বা সবদিক একত্রিত করে এই সহিংস আন্দোলন কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে? কে পরিচালনা করছে? মিরপুরে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়া হয়েছে, পোশাক কর্মীরা ককটেল পেল কোথায়?

সরকার মজুরি নির্ধারণে ওয়েজ বোর্ড গঠন করেছে, কিন্তু সময়সীমা বা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছাড়া ঘোষণা শ্রমিকদের কাছে যথেষ্ট নয়। এ কারণেই বিক্ষোভ থেমেনি। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শ্রমিকদের সহিংসতা নিঃশর্তভাবে সমর্থনযোগ্য নয়; তবে তা অযৌক্তিকও নয়। এটি মূলত অর্থনৈতিক বঞ্চনা, শ্রমিক সংগঠনের দুর্বলতা এবং শিল্প-সরকারের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধানে ব্যর্থতার ফল।

এখানে রাজনৈতিক সুযোগের প্রশ্নও আছে। সরকার দাবি করেছেন, কারখানার শ্রমিকদের অসন্তোষ সৃষ্টিতে বিদেশ থেকে অর্থ সরবরাহ ও দেশে অস্থিরতা ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু এ দাবির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো জনসমক্ষে আসেনি। তাই শ্রমিক বিদ্রোহকে পুরোপুরি “পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” বলা বিশ্লেষণগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বাস্তব কারণ হলো, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি বারবার অবহেলিত হচ্ছে, যার ফলে শ্রমিকের এই ক্ষোভকে যে কেউই কাজে লাগাতে পারে।

পর্যটনমৌসুমে সাজেক ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবরোধ পর্যটন খাতে সরাসরি আঘাত হানছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক ও বাসিন্দারা। সাজেকের সড়ক খুলে দেওয়া, পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পাহাড়ে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। অন্যদিকে, স্থানীয় সংগঠনগুলো পাঁচ দফা দাবিতে অবরোধের ডাক দিয়েছে; একই সময়ে জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে প্রশ্ন হলো, পর্যটন বন্ধ করে লাভবান কে? সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ব্যবসায়ী, গাড়িচালক, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মী এবং স্থানীয় দরিদ্র মানুষ। পাহাড়ে পানি, খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধের অভাবও এখন চরমে উঠেছে।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে যারা সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন এর সুযোগ নিয়ে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করতে চায়। যখন একটি অঞ্চলে সশস্ত্র দলের প্রভাব, চাঁদাবাজি ও রাস্তা অবরোধ একসঙ্গে চলে, তখন তা কেবল পর্যটন নয়, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ করে।

তাই পাহাড়ের সংকট শুধু আন্দোলন নয়; এটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি, স্থানীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। সরকারের কাজ হলো অবরোধকারীদের ন্যায্য দাবি আলোচনার টেবিলে নেওয়া, কিন্তু সশস্ত্র প্রভাব ও সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা।

সাবেক বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির লাশ তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে। সৌরি নানান ভাবে আলোচিত ও সমালোচিত ছিলেন।যেমন হাসিনার ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময়কার ভিডিও ধারণ করা বা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বেশ আলোচিত ছিলেন।

তার মৃত্যু বেশ রহস্য জনক। পুলিশি তদন্তে তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড, ডিজিটাল তথ্য ও ফরেনসিক নমুনা পরীক্ষা করছেন। তদন্তে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।

এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে। ফরেনসিক রিপোর্ট, সাক্ষীর বক্তব্য ও তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করা। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: কেন এত দ্রুত বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ায়? কারণ রহস্যজনক মৃত্যু জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করে, আর সেই অবিশ্বাসই রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত শক্তি ও কিছু রাজনৈতিক সংগঠন দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সরকার বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ আসছে এবং দেশে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা সহ্য করা হবে না।

এই দাবির যুক্তিটি এই, যখন একসঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষ, পাহাড়ি সংঘাত, রাস্তা অবরোধ ও রহস্যজনক ঘটনা ঘটে, তখন তা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে চাপে ফেলে। অর্থনীতি বিঘ্নিত হয়, বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে যারা সরকারকে দুর্বল করতে চায়, তাদের জন্য এটি সুবিধাজনক পরিবেশ।

বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরকারকে প্রশ্ন করেছেন, সীমান্ত দিয়ে অর্থ আসলে সরকার কেন তা বন্ধ করতে পারছে না। অর্থাৎ, ষড়যন্ত্রের দাবি করলেই সরকারের দায় শেষ হয় না। প্রমাণ প্রকাশ, তদন্ত স্বচ্ছ রাখা এবং জনগণের ন্যায্য দাবি পূরণ করাই ষড়যন্ত্র ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।

বাংলাদেশ অস্থির হলে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, ছোট ব্যবসায়ী ও পর্যটনশিল্পের কর্মীরা। পোশাক খাতে ৫২৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজহীন হয়ে পড়েছেন বলে খবর এসেছে। এটি রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।

রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে যারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসতে পারেনি, যারা সরকারের ব্যর্থতা বাড়িয়ে দেখাতে চায় বা যারা আন্তর্জাতিক অংশীজনদের কাছে বাংলাদেশকে “অস্থিতিশীল রাষ্ট্র” হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গিয়ে প্রমাণহীন অভিযোগ নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও স্বচ্ছ প্রশাসন প্রয়োজন। কোনো কিছুই গোপন না রেখে সরকার যদি সাধারণের কাছে প্রমান ভিত্তিক ও যুক্তিযুক্ত তথ্য তুলে ধরতে পারে তবে সংকটে থালকেও সরকার মানুষের আস্থার জায়গায় থাকবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতা একটি হঠাৎ করে সামনে আসা সংকট নয় বরং এটি অর্থনৈতিক বঞ্চনা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক স্বার্থের মিলিত ফল। শ্রমিকের ন্যায্য বেতন, পাহাড়ে আইনের শাসন, যে কোনো অপরাধের স্বচ্ছ তদন্ত এবং জনসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই চারটি পথেই সরকার জনবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। নইলে অস্থিরতাই হবে, আর এই অস্থিরতাকে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা।

 

 

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman

taraftarium24canlı maç izleselcuksportstaraftarium24canlı maç izletaraftarium24canlı maç izletaraftarium24canlı maç izletaraftarium24canlı maç izlecanlı maçtaraftarium24canlı maç izlemaç izletaraftarium24canlı maç izlemaç izletaraftarium24canlı maç izlemaç izleselçuk sportsselçuksportsjustin tvnetspor tv