লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের সামনে যে ৭ বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত: 11 সেপ্টেম্বর 2026

2 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, জলবায়ু সংকট, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতির এমন এক সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অধিবেশন শুরু হওয়ার পর এক বছরের জন্য ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব এখন তাঁর ওপর। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্যও তাঁর দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে: আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তন সামলে এমন জাতিসংঘ গড়ে তোলা যা সবার জন্য কার্যকর।

খলিলুর রহমানের সামনে তাই শুধু সভা পরিচালনার দায়িত্ব নয়। বিভিন্ন দেশের মতপার্থক্যের মধ্যেও সংলাপ, সমঝোতা ও ঐকমত্য তৈরির কঠিন কূটনৈতিক দায়িত্বও তাঁকে পালন করতে হবে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি সভা পরিচালনা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও পরামর্শ এগিয়ে নেওয়া এবং পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব পালন করেন।

১. যুদ্ধ ও বৈশ্বিক বিভাজনের মধ্যে শান্তির উদ্যোগ
ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সহিংসতার কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতি গভীর বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় শক্তিগুলোর মতপার্থক্য অনেক ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের কার্যকর উদ্যোগকে কঠিন করে তুলছে।

খলিলুর রহমান তাঁর অগ্রাধিকার তালিকায় সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণ পরিষদের সভাপতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরস্পরবিরোধী অবস্থানের রাষ্ট্রগুলোকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখা এবং জাতিসংঘকে শুধু বক্তব্য দেওয়ার মঞ্চের পরিবর্তে সমাধান খোঁজার জায়গা হিসেবে কার্যকর করা।

২. গাজাসহ মানবিক সংকটে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা
গাজা ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতি জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি সরাসরি কোনো সংঘাতের সামরিক সমাধান নির্ধারণ করতে পারেন না। তবে মানবিক সহায়তা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

খলিলুর রহমান তাঁর কর্মসূচিতে মানবাধিকার, মানবিক সহায়তা, শরণার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষাকে আলাদা অগ্রাধিকার হিসেবে রেখেছেন। ফলে গাজাসহ সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জাতিসংঘের নীতিগত অবস্থানকে কার্যকর আলোচনায় রূপ দেওয়া তাঁর অন্যতম কঠিন পরীক্ষা হতে পারে।

৩. জাতিসংঘ সংস্কারে ঐকমত্য তৈরি
আট দশক আগে তৈরি জাতিসংঘকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমানে জাতিসংঘের নিজস্ব সংস্কার উদ্যোগও এগিয়ে চলছে। জাতিসংঘের ‘ইউএন৮০’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সংস্থাটিকে আরও কার্যকর, সমন্বিত, জবাবদিহিমূলক ও ভবিষ্যৎ উপযোগী করা। ২০২৬ সালের মার্চে সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের বিভিন্ন ম্যান্ডেট তৈরি, বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনার পদ্ধতি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে।

এই সংস্কার বাস্তবায়নে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সম্মতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় ব্যয় কমবে, কোন কাঠামো বদলাবে এবং কোন দায়িত্ব নতুনভাবে বণ্টিত হবে তা নিয়ে দেশগুলোর স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। তাই সংস্কারকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সব পক্ষের আস্থা ধরে রাখাও খলিলুর রহমানের বড় পরীক্ষা।

৪. অর্থসংকট ও উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি
জাতিসংঘ যখন আরও বেশি কাজ করার চাপের মুখে, তখন সংস্থাটির সম্পদ ও অর্থায়ন নিয়ে চাপও বাড়ছে। ইউএন৮০ উদ্যোগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জাতিসংঘ ব্যবস্থায় সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে শান্তি, মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে।

খলিলুর রহমানের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের মধ্যে উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, ঋণের স্থায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের বিষয়ও রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন ও উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা তাই তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে।

৫. জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা খলিলুর রহমানের ঘোষিত অগ্রাধিকারের অন্যতম। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত ও দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন, অভিযোজন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

খলিলুর রহমান জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্বকে তাঁর কর্মসূচির একটি পৃথক স্তম্ভ করেছেন। তিনি ক্ষয়ক্ষতি তহবিলকে কার্যকর করা এবং স্বল্পোন্নত ও ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য সহজলভ্য ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।

৬. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির সুশাসন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে তেমনি বৈষম্য, নজরদারি, তথ্যের অপব্যবহার ও অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

খলিলুর রহমান তাঁর পঞ্চম অগ্রাধিকার স্তম্ভে ডিজিটাল শাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে রেখেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে প্রযুক্তির নীতিমালা তৈরিতে সমানভাবে অংশ নিতে পারে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমে আসে সে বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক শাসন নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনাও তাঁর কর্মসূচিতে রয়েছে।

৭. রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক আলোচনায় ধরে রাখা
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। সংকটের টেকসই সমাধান না হওয়ায় মানবিক চাপের পাশাপাশি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপরও চাপ বাড়ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান সরাসরি প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। তবে তাঁর দায়িত্ব ও কূটনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিক আলোচনায় জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারে শরণার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সব মিলিয়ে খলিলুর রহমানের এক বছরের দায়িত্ব এমন সময়ে শুরু হয়েছে যখন জাতিসংঘ নিজেই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করছে। তাঁর ঘোষিত কর্মসূচিতে ছয়টি আন্তঃসম্পর্কিত স্তম্ভের মাধ্যমে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার, প্রযুক্তি এবং জাতিসংঘ সংস্কারকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় শর্ত হবে নিরপেক্ষতা ও ঐকমত্য তৈরির সক্ষমতা। সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নয় বরং ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের জন্য এই পদ যেমন বড় কূটনৈতিক অর্জন তেমনি খলিলুর রহমানের জন্য এটি হবে আন্তর্জাতিক আস্থা ও নেতৃত্বের কঠিন পরীক্ষা।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman