দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
দেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও যানজটমুক্ত করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উড়ালসড়ক ও ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণ এবং মহাসড়কের সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই করিডোরের চেহারা বদলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনপথগুলোর একটি। দেশের বাণিজ্যিক পরিবহনের প্রায় ৬০ শতাংশ এই করিডোরের সঙ্গে সম্পর্কিত। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনের বড় অংশও এই সড়কপথ ব্যবহার করে। যানজট ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে এই পথে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়ে।
এই বাস্তবতায় মহাসড়কের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার অংশে ১৮ আগস্ট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত স্থাপিত ১ হাজার ৪২৭টি ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত গতি, ভুল পথে চলাচল, অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা ও জরিমানার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
আইন লঙ্ঘনের তথ্য সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে জরিমানার অর্থ পরিশোধের সুযোগও রাখা হয়েছে। এর ফলে আইন প্রয়োগে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে তথ্য ও দৃশ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবস্থা চালুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায়ই ৪৪৯টি মামলা করা হয় এবং মোট ১৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে অতিরিক্ত গতির অভিযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রাথমিক এই পরিসংখ্যান মহাসড়কে গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক পরিবহনের চাপ সামাল দিতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন পরিবহন গবেষণায় ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ যানজট এবং পরিবহন সময় বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এই করিডোরের ওপর বাণিজ্যিক চাপও ক্রমাগত বাড়ছে।
এই চাপ মোকাবিলায় মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান চার লেনের পাশাপাশি অতিরিক্ত লেন, সেবা সড়ক, উড়ালসড়ক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যুক্ত করার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যানজট কমাতে একাধিক ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর পাশাপাশি পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরকে প্রায় ২৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়ালসড়কে রূপান্তরের একটি পৃথক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে এবং সম্ভাব্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এটি এখনো বাস্তবায়নাধীন নির্মাণ প্রকল্প নয়। অর্থায়ন ও প্রকল্প অনুমোদনের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন হলেই বাস্তবায়নের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর উন্নয়নে কোন মডেল শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে তা নিয়েও নীতিগত আলোচনা রয়েছে। বিদ্যমান মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনার পাশাপাশি উড়ালসড়কভিত্তিক সমাধান নিয়েও পৃথক প্রস্তাব রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে যানবাহনের ভবিষ্যৎ চাপ, ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনের জন্য এই করিডোরের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কে সংযোগকারী সড়কগুলোতে সক্ষমতা বাড়ানো এবং যানজট কমানো বাণিজ্যিক পরিবহন দক্ষতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পরিবর্তনের পরিকল্পনা এখন তিনটি স্তরে এগোচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানার মাধ্যমে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে উড়ালসড়ক ও ভূগর্ভস্থ পথসহ গুরুত্বপূর্ণ যানজটপ্রবণ স্থানগুলোর উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে মহাসড়কের সক্ষমতা বাড়ানো। এসব উদ্যোগ যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগোতে পারলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডোরে যাতায়াতের সময়, দুর্ঘটনা ও পরিবহন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
