দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
কক্সবাজারে মাদক মামলার তদন্ত ও আসামি শনাক্তকরণে গুরুতর ভুলের অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে পরিচিত এক দিনমজুরের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন। পরে সেই মামলায় মৃত্যুদণ্ড হয় তাঁর নামে। কিন্তু প্রকৃত পরিচয় গোপন করা রমজান জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে গেলেও তাঁর দেওয়া পরিচয়ে থাকা সোনা মিয়া এখন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বন্দী।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজারে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম, বাবার নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। পরে একই বছরের সেপ্টেম্বরে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম ও ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবু সেই নামেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।

২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর মামলার রায়ে আদালত দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একজনকে খালাস দেওয়া হয়। মামলার সরকারি নথিভুক্ত তথ্যেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন হিসেবে সোনা মিয়ার নাম ছিল।
এরপর চলতি বছরের জুনে র্যাবের হাতে রামু থেকে সোনা মিয়া নামে এক দিনমজুর গ্রেপ্তার হন। আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হলে তিনি আদালতে আবেদন করে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন। ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার কোনো ঘটনাও তাঁর জীবনে ঘটেনি। তাঁর দাবি যাচাই করতে আদালত পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি আসলে মো. রমজান। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। অন্যদিকে প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। রমজান সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করতে তাঁর জন্মনিবন্ধনের তথ্য কাজে লাগিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, রমজান ও সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করতেন। সেই পরিচয়ের সূত্রেই রমজান সোনা মিয়ার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে পারেন। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে নিজের পরিচয় আড়াল করেন।
দুই সময়ের কারাগার নথি, ছবি, আঙুলের ছাপ ও শারীরিক শনাক্তকরণেও বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ২৫ বছর বয়সী, উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি ছিলেন। তাঁর শরীরে নির্দিষ্ট ক্ষতচিহ্নের কথাও নথিভুক্ত ছিল। বিপরীতে চলতি বছর গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর, উচ্চতা পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি। তাঁর শরীরে ভিন্ন ধরনের শনাক্তকরণ চিহ্ন রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একই মামলার আরেক আসামিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়াকে চিনতে পারেননি। পুলিশ আরও বলছে, বর্তমান সোনা মিয়া আগে কখনো গ্রেপ্তার বা কারাগারে বন্দী ছিলেন না।
এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অভিযোগপত্রে পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ে অসঙ্গতির কথা উল্লেখ থাকার পরও বিষয়টি গভীরভাবে যাচাই না করেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় এখন গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একজন নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে পাঠানো এবং প্রকৃত অভিযুক্তের পরিচয় গোপন করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া বিচারব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগজনক।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া প্রকৃত আসামি নন এবং প্রকৃত আসামি রমজান। এ বিষয়ে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে আদালতের পরবর্তী আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি।
সোনা মিয়ার পরিবার এখন তাঁর মুক্তি ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের অপেক্ষায়। একজন দিনমজুরের জীবনে অন্যের অপরাধের এমন ভয়াবহ বোঝা কীভাবে এসে পড়ল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্রঃ প্রথম আলো
