দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে শিশুদের উপর অকল্পনীয় যন্ত্রণা চলছে দুই বছর ধরে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে অন্তত ২০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে বলে জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে। এটি মানে প্রতি ঘণ্টায় একজন শিশুর মৃত্যু, যা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ শিশু হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, মোট নিহতের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু ও নারী, যা যুদ্ধের আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতিকে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ৭৪ শিশু হতাহতের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই দক্ষিণ গাজার ‘নিরাপদ অঞ্চল’ আল মাওয়াসিতে আশ্রয় নিয়ে ছিল।
অক্টোবর মাসে একটি পরিবারের ১১ সদস্য, যাদের মধ্যে ৭ শিশু ছিল, ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া, খান ইউনিসের আল-নাজ্জার পরিবারের ১০ ভাইবোনের মধ্যে মাত্র একজন বেঁচে ফিরেছে, বাকিরদের পোড়া দেহগুলো ছড়িয়ে ছিল ধ্বংসস্তূপে। সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৩ মাসে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একজন শিশু হত্যা করছে।
শুধু বোমাবর্ষণ নয়, অনাহার ও অপুষ্টিও শিশুদের প্রাণ যাচ্ছে অহরহ। ২০২৫ সালের জুনে অন্তত ৬৬ শিশু অপুষ্টিতে মারা গেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে। জাতিসংঘের তথ্যে, গাজায় ১ লক্ষ ৩২ হাজারের বেশি পাঁচ বছরের নিচের শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। ইসরায়েলের অবরোধের কারণে টিকাদান, দুধ ও ওষুধের সরবরাহ বন্ধ, যা শীতকালে হাইপোথার্মিয়ায় আরও শিশু মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেছেন, “গাজা শিশুদের জন্য কবরস্থান হয়ে উঠেছে।”

এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু মৃত্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। বেঁচে থাকা শিশুরা আজীবন এই অপুষ্টির আঘাত বয়ে বেড়াবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। জাতিসংঘের অনুমানে, ৪০ হাজারের বেশি শিশু আহত, যাদের মধ্যে অনেকের হাত-পা কেটে ফেলা হয়েছে।

স্কুল, হাসপাতাল ও বাড়িঘর ধ্বংসের ফলে লক্ষাধিক শিশু বাস্তুচ্যুত ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি সম্মিলিত অপরাধ, যাতে ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা আলবানিস তার প্রতিবেদনে এটিকে ‘সম্মিলিত যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই অবস্থায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা লজ্জাজনক। ইউনিসেফ ও অন্যান্য সংস্থা দাবি করছে, অবিলম্বে কার্যকর যুদ্ধবিরতি, যথাযথ সহায়তা প্রবেশের পথ খোলা এবং সঠিক চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসকের মাধ্যমে শিশুদের জীবন বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরী। গাজার শিশুরা শুধু সংখ্যা নয়, তারা ভবিষ্যতের প্রতীক।
সূত্র: UNICEF, Al Jazeera, Save the Children, The Guardian
