ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তার এক্স অ্যাকাউন্টের পোস্টে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং “সব সম্ভাব্য সাহায্য” দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের পেছনে মোদির উদ্দেশ্য কী? এটি কি সত্যিকারের মানবিকতা, নাকি কূটনৈতিক চাল? সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং পুরোনো সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা লুকিয়ে আছে।
এখানে একটি কথা উল্লেখ করে রাখা ভালো, হাসিনা আমলের প্রায় পুরোটা সময় ধরেই বিরোধী দল হিসাবে তো বটেই এবং খালেদা জিয়া ব্যাক্তিগতভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন। বেগম জিয়াকে তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেয়া হয়েছিল, তার অফিসের সামনে বালুর ট্রাক রেখে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছিল এবং তাকে অন্যায় ভাবে জেলে পাঠানো হয়েছিল। তিনি গুরতর অসুস্ত হয়ে পড়লেও তাকে উন্নত চিকিৎসার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় নাই। তখন এই সব কোনো ব্যাপারেই ভারত কোনো মন্তব্য করেনি। তাহলে এখন কেন বেগম জিয়াকে চিকিৎসা সাহায্য দিতে চায় মোদী?
মোদি তার পোস্টে লেখে, “বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি, যিনি বাংলাদেশের জনজীবনে দীর্ঘদিন অবদান রেখেছেন। আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা ও শুভকামনা তাঁর দ্রুত আরোগ্যের জন্য। ভারত সব সম্ভাব্য সাহায্য প্রদানের জন্য প্রস্তুত, যেকোনো উপায়ে।”
মোদির প্রস্তাব মানবিকতার ছদ্মবেশে কূটনৈতিক লক্ষ্যণ সুস্পষ্ট। ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশের প্রভু – ভৃত্য সম্পর্ক প্রায় শেষ হয়ে যায়। হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে। সীমান্ত হত্যা এবং তিস্তা পানি বণ্টনের বিরোধ চরমে, ব্যবসা বাণিজ্যেও বৈরী অবস্থা বিরাজ করছে, এছাড়াও ভারতীয় গণমাধ্যম ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েই চলেছে। ভারত, বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছে নতুন বেশ কিছু সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে, যা এখন পূর্ন সক্রিয় এবং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগের।
হাসিনা ফাঁসির রায় (১৭ নভেম্বর ২০২৫) পাওয়ার পর, বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ (২৩ নভেম্বর) করে হাসিনাকে ফিরিয়া দিতে, কিন্তু ভারতের জবাব, ‘খতিয়ে দেখছি’। এখন পর্যন্ত তারা হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই পোষণ করেনি। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সাহায্যের প্রস্তাব দিয়ে ভারত ‘মানবিক’ ভাবের আড়ালে চাপ কমানোর চেষ্টা করছে।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ভারতের জড়িত থাকার কথা বলেছে জাতীয় তদন্ত কমিশন। ৩০ নভেম্বরের জাতীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ভারতের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে, ৬৭ ভারতীয় নাগরিকের হদিস মিলছে না। এই প্রতিবেদনের পর মোদির প্রস্তাবকে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ এর অংশ হিসেবেই মনে হওয়া দোষের নয়।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২০২৫-এ ১৫০ এর বেশী বাংলাদেশী খুন হয়েছে। ভারতে হিন্দুত্ববাদী গ্রুপগুলো মুসলিমদের নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে যেমন, কাশ্মীরে ২০২৫-এ ৫০ এর অধিক নিপীড়ণের ঘটনা এছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই নানান অজুহাতে মুসলিমদের ঘর-বাড়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়গুলো বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দিচ্ছে। মোদির ভোটব্যাঙ্ক মূলত উগ্র হিন্দুত্ববাদ, কিন্তু বাংলাদেশ মুসলিম-প্রধান দেশ। খালেদা জিয়া, যাকে অনেক আলেম মুসলিমদের নেত্রীও বলেন, এই সাহায্যের প্রস্তাব দিয়ে মোদী বাংলাদেশে তার নিজের ‘মুসলিম-বিরোধী’ ইমেজ মোকাবিলা করতে চায়।
বাংলাদেশের আলেমরা যেমন, মিজানুর রহমান আজহারি খালেদা জিয়াকে ‘ইসলামী মূল্যবোধের প্রতীক’ বলে দেখেন। মোদির প্রস্তাব এই গ্রুপকে শান্ত করার চেষ্টা, কারণ ভারতের মুসলিম-বিরোধী নীতি CAA-NRC বাংলাদেশকে ভারত বিরোধী করে তুলেছে।
মোদির প্রস্তাব দেখতে মানবিক, কিন্তু এ সময়ে সন্দেহজনক। হাসিনার ফাঁসির রায়ের পর (১৭ নভেম্বর), পিলখানা তদন্ত প্রতিবেদনের পর পরই এই প্রস্তাব এসেছে। ভারত চায় আবারো বাংলাদেশ তাদের কব্জায় চলে আসুক যা তারা হাসিনাকে বাংলদেশের ক্ষমতায় রাখার মধ্যে দিয়ে তৈরী করেছিল। তারা বাংলাদেশকে তাদের ‘ব্যাকইয়ার্ড’ মনে করে।
মোদির প্রস্তাব মানবিকতার ছদ্মবেশে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় পুনরায় বাংলাদেশকে করদ রাজ্য বানানোর অপচেষ্টা বলেই মনে হয়। বাংলাদেশে বেগম জিয়া গণমানুষের নেত্রী হয়ে উঠেছেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় সব কয়টি রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ প্রকাশ্যেই এই ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশের সাথে করা এতো বছরের অন্যায়কে ধামা চাপা দিতেই এই প্রস্তাব। এই ধরণের প্রস্তাবকে দেশের মানুষ ও নেটিজেনদের অনেকেই ‘হাইপোক্রিসি’ বা ভণ্ডামি বা বাংলাদেশের জন্য নতুন পাতা কোনো ফাঁদ বলে মনে করেন । সত্যিকারের সাহায্য করতে হলে বাংলাদেশের সাথে সম্মান সূচক ও মর্যাদাপূর্ন সম্পর্ক তৈরী করতে হবে, পারস্পারিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান করতে হবে, বাণিজ্য একচেটিয়া না হয়ে ভারসময়পূর্ন হতে হবে, নইলে এই প্রস্তাব বিবেচিত হবে ধূর্ত কূটনৈতিক খেলাহিসেবে।

লেখক :
খন্দকার আজিজুর রহমান
হেড অব ফোটোগ্রাফি
দ্য ডেইলি অবজার্ভার
