দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বিশ্বখ্যাত বৈমানিক গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সাইফুল আজমের এক কিংবদন্তী বিমান যোদ্ধার নাম। আকাশযুদ্ধের ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হয় সাহস, দক্ষতা ও অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প হিসেবে। বিশ্বের একমাত্র বৈমানিক হিসেবে তিনি চারটি ভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানে ভূষিত হন, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম জন্মগ্রহণ করেন ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ সালে। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল শৃঙ্খলা ও সাহসিকতা। পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি নিজেকে দ্রুত একজন অসাধারণ ফাইটার পাইলট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে তাঁর দক্ষতা ও আকাশযুদ্ধ কৌশল তাঁকে এনে দেয় পাকিস্তানের অন্যতম সর্বোচ্চ সামরিক পদক সিতারা-ই-জুরাত, এই যুদ্ধে তিনি ভারতীয় বিমান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন ও তাদের যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত করেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ১৯৬৭ সালের আরব ইসরায়েল যুদ্ধের সময়। জর্ডান বিমান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করে তিনি ইসরায়েলের অন্তত ৪টি আধুনিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন, যা আরব বিশ্বে তাঁকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই অসামান্য অবদানের জন্য জর্ডান সরকার তাঁকে প্রদান করে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘অর্ডার অব ইস্তিকলাল’।
পরবর্তীতে ইরাক বিমান বাহিনীতে প্রশিক্ষক ও যোদ্ধা পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাইফুল আজম। সেখানে তাঁর পেশাদারিত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইরাক সরকার তাঁকে প্রদান করে ‘সোর্ড অব অনার’। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে তাঁর অবস্থান ও যুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন তাঁকে তাদের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে।
চার দেশের চারটি সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান পাওয়ার বিরল গৌরব তাঁকে দেয় “লিভিং ঈগল” উপাধি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক আকাশযুদ্ধের ইতিহাসে এমন সম্মান আর কোনো বৈমানিকের ভাগ্যে জোটেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শুধু একজন দক্ষ পাইলটই নন, ছিলেন একজন আদর্শ প্রশিক্ষক ও অনুপ্রেরণা। শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা আজও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্যদের পথ দেখায়।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম ১৪ জুন ২০২০ সালে ইন্তেকাল করেন। তবে তাঁর মৃত্যু আকাশযুদ্ধের ইতিহাস থেকে তাঁকে মুছে দিতে পারেনি। সাহস, কৌশল ও নৈতিক শক্তির প্রতীক হয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন স্মৃতিতে, ইতিহাসে এবং নতুন প্রজন্মের বৈমানিকদের স্বপ্নে।
