দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । মোঃ বুলবুল ভূইয়া ।
আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি সেই সময়ের সামনে, যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম শুনলেই মনে পড়ে যায় দুটো ছবি – একটা ২০২৪-এর উত্তাল জুলাই-আগস্টের, আরেকটা ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির রাতে পার্ক অভিযানের।

ডি.সি. মাসুদ আলম, যিনি তখন পাবনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন, ছাত্র-জনতার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ভাইরাল ভিডিওতে তাঁর কণ্ঠস্বর এখনো কানে বাজে: “আমার উপর দিয়ে যাইতে হবে… আগে আমাকে মারতে হবে।” সেই মুহূর্তে তিনি ছিলেন সাহসের প্রতীক, দায়বদ্ধতার জ্বলন্ত উদাহরণ। আমরা মুক্তিকামী জনসাধারণ তাঁকে সালাম জানিয়েছিলাম। কারণ তিনি প্রশাসনের পোশাক পরে থেকেও অন্যায়ের আজ্ঞাবহ না হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন জনতার পাশে।
কিন্তু সময় বদলেছে। প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। আজ তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার। রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, এসব জায়গায় মাদক, ছিনতাই, অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালাচ্ছেন। প্রশাসন বলছে, এটা জনস্বার্থে। রাজধানীর পার্কগুলো যেখানে মাদকসেবী ও অপরাধীদের আখড়া যা আমরা প্রায় সকলেই জানি, সে স্থানগুলো সাধারণ মানুষ, নারী, শিশু ও পরিবারের জন্য নিরাপদ করে তোলার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন মাসুদ সহ অন্নান্য সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এই অভিযান প্রশংসিত হওয়ার মতো। কারণ আমরা সবাই চাই , পার্কে গিয়ে শান্তিতে হাঁটতে, বই পড়তে, সন্তান নিয়ে খেলতে, মুক্ত বাতাশে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাঁটাতে। কিন্তু যেখানে সমস্যা, সেখানে প্রশ্ন উঠেছে পদ্ধতি নিয়ে। সাংবাদিকের উপর হামলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর লাঞ্ছনা, নিরপরাধ মানুষের হয়রানি – এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে শাহবাগে।
আমার ব্যাক্তিগত পর্যালোচনায় ঃ
- জনস্বার্থে অভিযান চালানো দরকার, কিন্তু মানবিকতা ও আইনের সীমা লঙ্ঘন করে নয়।
- মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে, কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে শুধু উৎখাত করলে সমস্যা সমাধান হয় না – তারা আমাদেরই সমাজের অংশ।
- পুলিশ যদি কঠোর হয়, তাহলে তার দায়িত্ব আরও বেশি – কোনো নিরপরাধের উপর অত্যাচার যেন না হয়। সাংবাদিকের ক্যামেরা ভাঙা, ছাত্রকে মারধর – এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়।
এটাও ঠিক যে, প্রশাসনিক দায়িত্ব মানে সবাইকে খুশি করা নয় – মানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, যা জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে। ডি.সি. মাসুদের সাহস আমরা দেখেছি। এখন দেখতে চাই তাঁর বিচক্ষণতা ও মানবিকতা। যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সংশোধন করুন। যদি সঠিক হয়, তাহলে পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনুন।
আমরা চাই আন্তর্জাতিক মানের পুলিশিং, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে মানুষের অধিকারকে সর্বচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। পার্ক নিরাপদ হোক, কিন্তু সাধারণের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে নয়, মাদকমুক্ত হোক, কিন্তু মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকুক।
ইতিহাস আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি ও ন্যায় দিয়ে বিচার করে। ডি.সি. মাসুদ – আপনি সময়ের আয়নায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার কাজের ফলাফলই বলবে, আপনি কি সত্যিকারের পরিবর্তনের অংশ, নাকি শুধু একটা অধ্যায়।
