দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বছরের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন অমর একুশে বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প, পাঠক-প্রবণতা এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটি আয়না। ২০২৬ সালের আয়োজন ঘিরে শুরু থেকেই যে টানাপোড়েন দেখা গেছে, তা মেলার বাস্তব চিত্রটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
সময় নিয়ে দ্বিধা, অংশগ্রহণে শর্ত
রমজান মাসে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রকাশকদের একাংশ আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রায় ৩৫০টি প্রতিষ্ঠান শর্তসাপেক্ষে অংশ নিচ্ছে। তাদের দাবি ছিল, বিক্রির সময় কমে গেলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছানো হলেও প্যাভেলিয়ন না রাখার সিদ্ধান্তে বড় প্রকাশনাগুলোর প্রচারণা কৌশলে পরিবর্তন এসেছে।
প্রকাশকরা বলছেন, স্টল বরাদ্দ ও প্রস্তুতির সময় কম পাওয়ায় অনেকেই উদ্বোধনের দিনেও সাজসজ্জার কাজ শেষ করতে পারবেন না। এতে প্রথম কয়েকদিন বিক্রি স্বাভাবিক গতি পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিক্রির বাস্তবতা
প্রকাশনা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বইমেলায় মোট বিক্রির বড় অংশ আসে ছুটির দিনে। এ বছরও ছুটির দিনে সকাল ১১টা থেকে মেলা খোলা থাকলেও রমজানের কারণে সন্ধ্যার পর ক্রেতা উপস্থিতি কেমন হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
একজন মাঝারি মানের প্রকাশক জানান, মুদ্রণ ব্যয় গত দুই বছরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কাগজ, কালি, পরিবহন খরচ সবই বাড়তি। অথচ পাঠকের ক্রয়ক্ষমতা একই হারে বাড়েনি। ফলে অনেক প্রকাশক সীমিত সংখ্যক নতুন বই প্রকাশ করেছেন।
‘জিরো ওয়েস্ট’ উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত
মেলাকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে, তবে সব প্রকাশকের পক্ষে তা মানা সহজ নয়। খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ছোট প্রকাশকদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তবে আয়োজকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশবান্ধব আয়োজনই টেকসই সমাধান।
নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা
মেলায় আর্চওয়ে, সিসিটিভি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশপথ ব্যবস্থাপনায় কিছু উন্নতি হলেও ছুটির দিনে অতিরিক্ত চাপ সামলানো এখনো বড় পরীক্ষা।
এছাড়া যানজট ও পার্কিং সংকটও দর্শনার্থীদের জন্য নিয়মিত সমস্যা। শাহবাগ ও টিএসসি এলাকার আশপাশে সন্ধ্যার পর যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।
শিশু ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
শিশুচত্বর, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বইমেলার প্রাণ। তবে বাস্তবতা হলো, মূল ভিড়ের সময়ে এসব আয়োজন অনেক দর্শনার্থীর চোখ এড়িয়ে যায়। সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে সময়সূচি ও প্রচারে নতুন কৌশল প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতি ও প্রত্যাশা
প্রকাশনা শিল্পে বইমেলা এক মাসের উৎসব হলেও অর্থনৈতিকভাবে এর প্রভাব সারা বছরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রির বড় অংশ আসে এই সময়েই। ফলে মেলার সাফল্য বা ব্যর্থতা সরাসরি শিল্পের টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত।
সাহিত্যিক ও গবেষকদের মতে, শুধু বিক্রির পরিসংখ্যান নয়, পাঠকের আগ্রহ, বইয়ের বৈচিত্র্য এবং নতুন লেখকদের উপস্থিতিই মেলার আসল সূচক।
সব মিলিয়ে বইমেলা ২০২৬ একদিকে উৎসব, অন্যদিকে পরীক্ষা। আয়োজন কতটা সুশৃঙ্খল হয়, বিক্রি কতটা প্রত্যাশা পূরণ করে, আর পাঠক কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়—এই তিন সূচকেই নির্ধারিত হবে এবারের মেলার প্রকৃত সাফল্য
