দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
কুড়িগ্রাম, ১৮ এপ্রিল ২০২৬: আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগে, ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল ভোরবেলা। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার নিরীহ বড়াইবাড়ি গ্রাম ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল অস্ত্রের গর্জনে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর শত শত সৈন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে বিডিআর ক্যাম্প দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি — এই গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার অকুতোভয় বীরেরা।
সেই দিনের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্ত ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ, “বড়াইবাড়ি যুদ্ধ”।
ভোর পাঁচটার দিকে। গ্রামবাসী সাইফুল ইসলাম লাল (আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) তাঁর কৃষিজমিতে সেচের পানি দেখতে গিয়ে হঠাৎ ধান ক্ষেতের মধ্যে দেখতে পান অস্ত্রধারী সৈন্যদের এক বিশাল দল। তারা হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করছিল, “বিডিআর ক্যাম্প কোথায়?” সাইফুল বুঝতে পারেন, এরা ভারতীয় বিএসএফের সদস্য। বিএসএফ কে ভুল রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে তিনি দৌড়ে বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে খবর দেন।
তখন ক্যাম্পে মাত্র ৮ জন বিডিআর সদস্য ছিলেন। সাইফুলের খবর পেয়ে তারা তৎক্ষণাৎ অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হয়ে যান। কয়েক মিনিটের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। গ্রামবাসীরা পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ফিরে এসে বিডিআরের পাশে দাঁড়ান। রুহুল আমিন (পরবর্তীকালে সংসদ সদস্য) তখন গ্রামবাসীদের সংগঠিত করছিলেন। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১২ জন প্রশিক্ষিত সদস্যও অংশ নেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সাইফুল ইসলাম লাল পরে বলেছিলেন, “ক্যাম্প থেকে দেখলাম কয়েকশ বিএসএফ সদস্য বাংলাদেশের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আমরা প্রথম চার ঘণ্টা একাই লড়াই করেছি। শত শত গুলির আওয়াজে পুরো গ্রাম কেঁপে উঠছিল।”
সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১১টা পর্যন্ত একটানা গোলাগুলি চলে। পরে ময়মনসিংহ ও জামালপুর থেকে অতিরিক্ত বিডিআর সদস্য এসে যোগ দেন। দিনভর এবং রাতেও থেমে থেমে যুদ্ধ চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ১৬ জন বিএসএফ সৈন্যের মৃতদেহ পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পক্ষে ৩ জন বিডিআর সদস্য শহীদ হন।
এটি ছিল বিএসএফের একটি ‘প্রতিশোধমূলক’ অভিযান। কয়েকদিন আগে সিলেটের পদুয়া সীমান্তে বিডিআরের সফল অভিযানের জের ধরে তারা বড়াইবাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী ও সাধারণ গ্রামবাসীরা তাদের সেই স্বপ্ন চুরমার করে দেন।
প্রতি বছর ১৮ এপ্রিলকে ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই দিনে বিজিবি ও স্থানীয় জনতা শহীদদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। বড়াইবাড়ি আজ শুধু একটি গ্রামের নাম নয়, এটি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের অদম্য সাহস ও জাতীয় মর্যাদার প্রতীক।
এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, সীমান্তের প্রতি ইঞ্চি মাটি রক্ষায় বাংলাদেশের সেনা, আনসার, গ্রামবাসী সবাই এক। কোনো আগ্রাসন এই মাটির স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
