লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

স্বপ্নাকে কতবার কইছি বইন দরজাটা খুইলা দে, সে খোলে নাই

প্রকাশিত: 02 জুন 2026

14 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

রাজধানীর পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর হত্যার মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার। মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে তাদের দেওয়া সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এক অবর্ণনীয় বেদনা ও মর্মান্তিক ঘটনার বিবরণ।

১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আব্দুল হান্নান মোল্লা অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে ক্যান্টনমেন্ট হয়ে বনানীর কাকলীতে পৌঁছান। অফিসে পৌঁছানোর পর স্ত্রী পারভীন আক্তারের ফোন পেয়ে তিনি দ্রুত বাসায় ফিরে আসেন। বাসায় ফিরে দেখেন ভবনের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছেন। তৃতীয় তলায় আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে জানতে পারেন, তাদের ছোট্ট মেয়ে রামিসা পাশের ফ্ল্যাটের ভেতরে আটকে আছে।

প্রতিবেশীরা দরজা খুলতে না পেরে ভাঙার চেষ্টা করছিলেন। এক পর্যায়ে ভেতর থেকে দরজার মূল লক খুলে দেন আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন। ঘরে ঢুকে সবাই টয়লেটের সামনে রক্তের ছোপ দেখতে পান। সেখানে স্বপ্না খাতুন দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর আসামিদের ব্যবহৃত কক্ষের স্টিলের খাট উঁচু করে আব্দুল হান্নান মোল্লা দেখতে পান তার নিজের মেয়ের বিচ্ছিন্ন মাথা। এই দৃশ্য দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন রামিসার বাবা। অসুস্থ বোধ করায় আদালতের অনুমতি নিয়ে চেয়ারে বসে সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, পরে পুলিশ এসে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে। তিনি থানায় গিয়ে মামলার এজাহার দায়ের করেন।

জেরার সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী যখন জিজ্ঞাসা করেন ঘটনার সময়, অফিস থেকে বাসায় ফিরতে কতক্ষণ লেগেছে এবং তিনি সবকিছু নিজ চোখে দেখেছেন কি না, তখন তিনি শান্ত কণ্ঠে বলেন, “আমি যতটুকু দেখেছি, তাই বলেছি।” আসামিদের সঙ্গে তার আগে থেকে কোনো পরিচয় বা শত্রুতা ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। সাক্ষ্য শেষে পুলিশের সহায়তায় অত্যন্ত বিমর্ষ অবস্থায় আদালত ত্যাগ করেন তিনি।

রামিসার মা পারভীন আক্তারও আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি রান্না করছিলেন। বড় মেয়ে রাইসাকে বলেন ছোট মেয়ে রামিসাকে নিয়ে চাচার বাসায় যেতে। কিছুক্ষণ পর রামিসার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো তারা চলে গেছে। হঠাৎ চিৎকারের শব্দ শুনতে পান, তবে সেটা দূর থেকে মনে হয়েছিল। গেটের সামনে গিয়ে দেখেন দরজা খোলা।
বড় মেয়ে ফিরে আসার পর রামিসাকে না পেয়ে তিনি ভবনের বিভিন্ন তলায় খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তৃতীয় তলায় আসামিদের ফ্ল্যাটে গিয়ে বারবার দরজায় ধাক্কা দেন। কিন্তু কেউ দরজা খোলে না। দরজার নিচে রামিসার জুতো দেখতে পান। তখন তিনি চিৎকার শুরু করেন। ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা জড়ো হন। স্বামীকেও ফোন করেন।

প্রতিবেশীরা উঁকি দিয়ে কিছু দেখতে না পেলেও, রাজু নামে এক যুবককে ভেতরের ভিডিও করতে দেখা যায়। ভেতরে স্বপ্না খাতুন হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এক পর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সবাই বাথরুমে ছোপ ছোপ রক্ত দেখতে পান।

পারভীন আক্তার আদালতে আসামি স্বপ্না খাতুনকে দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “স্বপ্নাকে কতবার কইছি বইন দরজাটা খুইলা দে, সে খোলে নাই।” তিনি আরও বলেন, সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যা করেছে।

জেরায় তিনি জানান, সোহেল রানা খুন করেছে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন তাকে সহযোগিতা করেছেন। সোহেল গ্রিল কেটে পালিয়েছে বলেও আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে শুনেছেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনায় একটি নিরীহ শিশুর জীবন নির্মমভাবে শেষ হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের বুক ভাঙা কান্না ও আদালতে দেওয়া তাদের আবেগঘন সাক্ষ্য প্রমাণ করে, কোনো শিশুর এমন নৃশংস মৃত্যু কোনো মা-বাবা কখনো সহ্য করতে পারেন না। এই ঘটনা আমাদের সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার প্রশ্নকে সামনে এনে দেয়।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman