যথাযথ ব্যাবস্থাপনায় ঝুঁকি মোকাবেলা সম্ভব
দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
পদ্মা নদীর ওপর প্রস্তাবিত ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে মন্তব্য করেছেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মোহসিনুল করিম। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীকে সচল রাখতে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি থেকে সাত হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
সম্প্রতি একটি বিশেষ আলোচনায় তিনি বলেন, নদী কোনো স্থির কাঠামো নয় বরং এটি একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। পানির প্রবাহ, ভূমির গঠন এবং পলির গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে নদীর আচরণ নির্ধারিত হয়। তাঁর মতে, দীর্ঘ নদীপথে ড্রেজিং করে পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা বাস্তবে স্থায়ীভাবে কার্যকর রাখা কঠিন, কারণ উজান থেকে আসা পানির চাপ ও পলি জমার কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া কাঠামো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, ব্যারেজ নির্মাণের পর বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তৈরি হবে, যা কৃষি উৎপাদন বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। তার মতে, পরিকল্পনার অনেক অংশ বাস্তব প্রাকৃতিক প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি নতুন ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, সাংবাদিক ফকির শওকত বলেন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে ফারাক্কা ইস্যুতে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পানিবণ্টন নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় দেশের দরকষাকষির সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ইস্যুতে অবস্থান পরিবর্তন ঘটতে পারে।
সাংবাদিক মাহবুব আলম বলেন, ঐতিহাসিকভাবে নদী ব্যবস্থাপনা ও পানির ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নে আন্দোলন এবং কূটনৈতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে আঞ্চলিক বাস্তবতা এবং আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প কেবল প্রকৌশলগত বিষয় নয়, বরং এটি পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ পলি জমা, নদীভাঙন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীদের অনেকেই মনে করেন, সঠিক নকশা ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প কৃষি সেচ ও পানিসংকট নিরসনে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে পদ্মা ব্যারেজ ঘিরে চলমান আলোচনা এখন কেবল উন্নয়ন প্রশ্ন নয়, বরং এটি পরিবেশগত ভারসাম্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি জটিল সমীকরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
