দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বাংলাদেশ পুলিশের ৬ হাজার ৫৩৯ পরিদর্শকের বিষয়ে গোপনে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে এ বিষয়ে একটি বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে পরিদর্শকদের ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক তথ্যের পাশাপাশি বর্তমান ও আগের কর্মস্থল, দায়িত্ব পালনের ইতিহাস এবং কোনো ধরনের বিভাগীয় দণ্ড থাকলে তার বিবরণ চাওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহে অনলাইন গুগল ফরম ব্যবহারের কথাও জানা গেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের প্রকাশ্য কাঠামো অনুযায়ী পরিদর্শক পদটি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বস্থানীয় পদগুলোর একটি। পুলিশের দায়িত্ব ও পদমর্যাদার কাঠামোতে কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দায়িত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শকদের মধ্য থেকেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তদন্ত কর্মকর্তা এবং অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত, অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি থানার কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন করে ওসি পদায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দায় বা অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ওসি পদায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ এর আগেই যোগ্যতা ও চাকরির রেকর্ডভিত্তিক একটি কাঠামো চালু করেছে। ২০২৫ সালে জারি করা ২২ দফা নীতিমালায় পরিদর্শক হিসেবে অন্তত তিন বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড এবং বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের ফলাফলসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। ৫৪ বছরের বেশি বয়সী কর্মকর্তা এবং নির্দিষ্ট ধরনের গুরুতর শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওসি হওয়ার অযোগ্য রাখার বিধানও রয়েছে।
নীতিমালায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়সীমা এবং একই থানায় পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। ফিটলিস্টে থাকা কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদায়নের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি থানার দায়িত্ব নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার শর্তও রয়েছে।
তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও পদায়ন কাঠামো নিয়ে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ২০২৪ সালের পর পুলিশ সংস্কার নিয়ে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ উঠে আসে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি পরে বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করে। তাদের বিশ্লেষণে পুলিশি সেবায় জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, জবাবদিহি বাড়ানো এবং নাগরিককেন্দ্রিক আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সরকারিভাবে পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন এবং পরে কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের মধ্য দিয়ে পুলিশ ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত নথিতে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন সংরক্ষিত রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফলে ৬ হাজার ৫৩৯ পরিদর্শকের তথ্য সংগ্রহের বর্তমান উদ্যোগ বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং এর ভিত্তিতে ওসি পদায়নে কতটা পরিবর্তন আনা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান যোগ্যতাভিত্তিক পদায়ন নীতিমালা কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তার ওপরও পুলিশের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের মান ও জনআস্থার বিষয়টি নির্ভর করবে।
সূত্রঃ আমার দেশ
