দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বাংলাদেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সংকট নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি হিসাবে দেশে এলপিজির সামগ্রিক সরবরাহে ঘাটতি নেই। অথচ রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার দোকান বন্ধ রেখেই গোপনে বেশি দামে সিলিন্ডার সরবরাহের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ এনার্জি নিয়ন্ত্রক কমিশন ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার আফতাবনগরের একটি এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি দোকান বন্ধ। একটি দোকানের কর্মচারী জানান, হাতে অল্প কিছু সিলিন্ডার এসেছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম চাওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ টাকা। আরেকটি দোকান থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকায় সিলিন্ডার দেওয়ার কথা জানানো হয়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী আবার দোকান বন্ধ রেখেও বাড়িতে সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেন একই দামে।
সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের এই বড় ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসকদের মাঠপর্যায়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বুধবার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি জানতে চেয়েছেন, স্বাভাবিক আমদানির পরও কোথাও কেন সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কেন গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি বা নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এর এক দিন আগেই এলপিজি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা সরকারের সঙ্গে বৈঠকে দেশে এলপিজির কোনো সামগ্রিক সংকট নেই বলে জানিয়েছিলেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।
তবে আমদানি ও বাজারে সরবরাহের মধ্যকার ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সেপ্টেম্বরজুড়েও হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক নিচে ছিল বলে রয়টার্সের তথ্য বলছে।
এ পরিস্থিতির প্রভাব শুধু এলপিজি বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। কাতারের এলএনজি সরবরাহও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে ব্যাহত হয়েছে। এশিয়ার কয়েকটি দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্যও নির্ধারিত সরবরাহ স্থগিত হওয়ার কথা জানিয়েছে কাতার এনার্জি।
বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে অবশ্য আমদানিকারকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের সংগঠনের নেতাদের দাবি, আমদানিকারক পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার স্তরে গ্রাহকের কাছে গ্যাস পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ফলে খুচরা পর্যায়ের বাড়তি দামের দায় সরাসরি আমদানিকারকদের ওপর বর্তায় না বলে তারা দাবি করছেন।
এদিকে সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত দামও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কমিশনের হিসাবে সৌদি আরামকোর সেপ্টেম্বরের চুক্তিমূল্যের ভিত্তিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা করা হয়।
বাজারে সংকটের আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে এলপিজি আমদানি কমেছে। আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহপথের অনিশ্চয়তা আগামী মাসের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার এখন মূলত দুটি বিষয় খতিয়ে দেখছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহপথের বাস্তব সংকট কতটা প্রভাব ফেলছে তা নির্ধারণ করা। অন্যদিকে দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না তা বের করা।
তদন্ত শেষ হলে পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তবে এরই মধ্যে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। রান্নার প্রধান জ্বালানির একটি অংশ হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য এই বাড়তি ব্যয় এখন সরাসরি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চাপ বাড়াচ্ছে।
