আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পালাগান, বাউলগান, যাত্রা এসব উৎসবের সঙ্গে মানুষের জীবন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্তে এই অনুষ্ঠানগুলো বেশ ধুমধামের সাথে পালিত হয়ে আসছে। আবার এসব অনুষ্ঠানের বিরোধী মতোও এই দেশে প্রচলিত। কিন্তু মারামারি বা সংঘর্ষের উদাহরণ খুব কম।
কয়েক দিন আগে বাউল আবুল খায়েরকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুলিশ আটক করে, আর তার সমর্থকদের মানিকগঞ্জে সাধারণ জনতা মারধর করে, এমন অভিযোগ উঠেছে। এখানে দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ বাউলদের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচী পালন করছে, কিন্তু একই সাথে এটা বলাও তাদের দায়িত্ব যে বাউলের মন্তব্যটি যে অনুচিত এবং কুরুচিপূর্ন এবং দেশের আইনে শাস্তিযোগ্য। বাউলদের পেটানোটাও ন্যাক্কারজনক, কারণ আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।
এই প্রসঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আগে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ, আদর্শ, মন-মগজ আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। দেশের জনগণের বড় একটা অংশ সবধরনের গান-বাজনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বা উপভোগ করলেও বেশিরভাগ মানুষ ওই দর্শনের সঙ্গে একমত হয় না বা ধারণ করেন এমনকি অনুসরণও করে না। যেমনঃ লালনের গান অনেকেই শোনেন কিন্তু লালন দর্শন তারা ধারণ করেননা, একই কথা রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও।
দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায় তাদের ধর্মের মূলভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা অবমাননাকর কোনো বিষয় কখনোই মেনে নেয় না, বরং তাদের প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়। আল্লাহ বা রসূলের বিরুদ্ধে কোনো কুমন্তব্য এদেশের মানুষ একেবারেই সহ্য করে না, তা দেশেই হোক বা বিদেশে। এর প্রমাণ অজস্র। যে দেশের মানুষের মনস্তত্ব যেমন, ওই বাস্তবতা মেনে নিয়েই সেখানে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত। না হলে স্বাভাবিক ভাবেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে ধর্মানুরাগী মুসলিমদের মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ আছে, কিন্তু সংঘর্ষের ঘটনা খুবই কম। বিগত দুই দশকে এটার মাত্রা বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু নিপীড়ন আর ইসলামী জঙ্গীবাদের বয়ান প্রতিষ্ঠা করে সমাজে নিপীড়ন চালানো ও বিভক্তি আনা হচ্ছে। যার প্রভাব বাংলাদেশেও নেহায়েৎ কম নয়। বাউল বা শিল্পীদের ধর্মের বিরুদ্ধে সরাসরি কটূক্তি করার নজির কম। এই কাজটি সাধারণভাবে দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, লেখক বা শিক্ষকরা করে থাকে সমাজে নতুন বয়ান তৈরী করতে, এরও নজির বিশ্বব্যাপী অনেক।
বাউলের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কটূক্তি দেশের গণমানুষ মেনে নেবে না, এ কথাটি এখন পর্যন্ত কোনোদার্শনিক বা বুদ্ধিজীবী বা মানবাধিকারকর্মী বলছে না। এতে সমাজে বিভক্তি বাড়ছে। উদাহরণ হিসাবে যদি বলি, আমেরিকা বা ফ্রান্সে যা অবলীলায় বলা যায়, বাংলাদেশ বা ভারত-পাকিস্তানে তা বললে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করবে। অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্যের বাস্তবতা অবশ্যই মেনে নিতে হবে।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি টালমাটাল, বাংলাদেশের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বিদেশী শক্তি ও তাদের এ দেশীয় দোসররা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সাধারণ মুসলমানদের ক্ষোভকে ‘তৌহিদী জনতা’ বলে কট্টরপন্থী বা উগ্রপন্থী অভিহিত করে তাদের প্রতিবাদকে মব বলে সামাজিক বিভেদ আরো উস্কে দেয়া হচ্ছে। এতে ধর্মানুরাগী মুসলিম আর অপেক্ষাকৃত কম সংবেদনশীল মুসলিমদের প্রতিপক্ষ করার চেষ্টা চলছে।
আইন হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়, কিন্তু গণমানুষের ধর্ম বিশ্বাস ও স্পর্শকাতর অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন মন্তব্যও উচিত নয়। সমাজের শান্তি রক্ষায় সবাইকে সংযত হতে হবে। আর ঠিক এই জায়গায়ই সমাজের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, দার্শনিক ও কবি- সাহিত্যিকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

লেখক
খন্দকার আজিজুর রহমান
হেড অব ফটোগ্রাফি
দ্য ডেইলি অবজার্ভার
