দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাস, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় বড় উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর প্রস্তাবিত এ ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন বলে আশা করছে সরকার। প্রকল্পটির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানির সরবরাহ বাড়ানো, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। প্রথম পর্যায়ে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। পুরো অর্থায়ন হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজের কাজের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে এবং ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। কৃষি ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যে সংকট মোকাবিলায় ব্যারাজ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে পরিবেশ ও জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়াকে এ সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর প্রভাবে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়ালসহ বিভিন্ন নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার প্রভাব বাড়ছে। উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ সুপেয় পানির সংকটে পড়ছেন। কৃষকেরা সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় পানির স্তর কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করতে না পারায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার সমস্যা দেখা দেয়।
নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন, নৌচলাচল ও নদীনির্ভর জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের মিঠাপানির প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
যা থাকছে প্রকল্পে
প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট, ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ, দুটি মাছ চলাচলের পথ, নৌযান চলাচলের জন্য জলকপাট, গাইড বাঁধ ও সংযোগ বাঁধ।
ব্যারাজে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পেও সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা প্রকল্পের আওতায় আসবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুফলের পাশাপাশি সতর্কতার পরামর্শ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে মিঠাপানির সরবরাহ ও প্রবাহ বাড়ানো জরুরি। পদ্মা ব্যারাজ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন, উজানে নদীর ক্ষয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা এবং পানি ও মাটির লবণাক্ততা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেছেন, ফারাক্কার প্রভাবে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষি, নৌচলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় এ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো বাংলাদেশ ও ভারতের ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ৩০ বছর মেয়াদি এ চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে পদ্মা ব্যারাজের সুফল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের কারিগরি বাস্তবায়ন, নদীর পানিপ্রবাহ এবং আন্তসীমান্ত পানিব্যবস্থাপনার ওপরও।
প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, পরিবেশ ও জনজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে বড় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি পানিব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে প্রকল্পটির সফলতার প্রধান শর্ত।
