যুদ্ধক্ষেত্রে গোলা-বারুদের শব্দ যতই ভয়ঙ্কর হোক, ইতিহাস বলে, আদর্শের লড়াইয়ে চূড়ান্ত বিজয় এনে দেয় দর্শন বা বয়ানের শক্তি, অব্যাহত স্বকীয় সাংস্কৃতিক চর্চা আর বুদ্ধিবৃত্তিক দূরদর্শী ভাবনা। বন্দুকের নল যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকে শুরু হয় কলম, শিক্ষা, সাহিত্য ও গণসংস্কৃতির অস্ত্র, যা জাতীকে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রাখে।
নাজি জার্মানির পরাজয় তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ। ১৯৪৫ সালে হিটলারের আত্মহত্যা আর বার্লিনের পতনের পরও মিত্রশক্তি যদি কেবল সামরিক জয়েই সন্তুষ্ট থাকত, তাহলে নব্য-নাজিবাদ আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো এবং আজও বর্তমান থাকতো।
নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে হলোকাস্টকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছে নগ্ন সত্য হিসেবে। চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’, অ্যানি ফ্রাঙ্কের ডায়েরি, হলিউডের শত শত চলচ্চিত্র, জার্মানির পাঠ্যপুস্তকে ‘নাৎসি অপরাধ’-এর অধ্যায় বাধ্যতামূলক করা, এমনকি সোয়াস্তিকাকে ঘৃণিত প্রতীকে পরিণত করা, এই সবই ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি বয়ানের যুদ্ধ। ফলাফল? আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল খোলাখুলি নাজিবাদের পক্ষে দাঁড়াতে সাহস পায় না। এটাই গ্রহণযোগ্য বয়ান প্রতিষ্ঠার শক্তি।
একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব কমিউনিজমকে কেবল সামরিকভাবে নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও পরাজিত করেছে। ‘গুলাগ আর্কিপেলাগো’, ‘১৯৮৪’, হলিউডের অ্যান্টি-কমিউনিস্ট প্রোপাগান্ডা, রেডিও ফ্রি ইউরোপের সম্প্রচার, এসবের সম্মিলিত আঘাতে কমিউনিজমকে ‘মানবতাবিরোধী মতাদর্শ’ হিসেবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে বিশ্বের চেতনায়। ফলে আজ রাশিয়া নিজেই কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। আমাদের চেনা শত্রু যখন নাম-ঠিকানা-ইতিহাস সহ সবই জানা, তখন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আমরা আগে থেকেই জানি। আমাদের কর্তব্য হলো একটি অপ্রতিরোধ্য বয়ান গড়ে তোলা, গত দেড়-দশক ধরে গড়ে ওঠা গোলামীর বয়ান ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্ত বাংলাদেশের বয়ান পুনরায় বিনির্মাণ করা। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ, এই সবকে কেবল রাজনৈতিক ইস্যু না বানিয়ে বিশ্বমানের শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র-গবেষণার বিষয়বস্তুতে রূপান্তর করতে হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা অগ্ৰাসনকারীদের চিন্নিত করতে পারে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে নির্দ্বিধায় প্রাণও উৎসর্গ করতে পিছ পা না হয়।
কিন্তু এই লড়াইয়ে তাড়াহুড়ো চলবে না, ক্লান্ত হওয়া চলবে না। দেশের স্বার্থে রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বয়ান একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না, একদিনে প্রচলিত অপসংস্কৃতি ও চাপিয়ে দেওয়া বয়ান ভাঙাও যাবেনা। এর জন্য দরকার জাতিয় ঐক্য, ধৈর্য আর অবিরাম বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। যখন আমরা আমাদের সত্যকে শুধু চিৎকার করে নয়, যুক্তি, শিল্প-সংস্কৃতির ভাষায় বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারব, দেশের তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারবো তখনই কোনো বিদেশী কুচক্রী আগ্রাসন বা অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগী শক্তি আর মাথা তুলতে পারবে না।
আদর্শের লড়াইয়ে শুধু পেশী-শক্তি নয়, দেশপ্রেম, কলম ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই হলো প্রতিরোধের অস্ত্র। আমরা যদি এই অস্ত্রে শাণ দিতে পারি, তবে বিজয় কেবল সময়ের অপেক্ষা।

লেখকঃ
খন্দকার আজিজুর রহমান
হেড অব ফোটোগ্রাফি
দ্য ডেইলি অবজার্ভার
