দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে লোহিত সাগর উপকূল থেকে সরে আসা সরকারি বাহিনীর সদস্যদের পুনর্গঠন করে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ও মারিব প্রদেশের গভর্নর সুলতান আল আরাদা জানিয়েছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক পরাজয়ের পর সেনারা এখন মারিবে পুনর্গঠিত হচ্ছে। লক্ষ্য, হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে স্থল অভিযান শুরু করা এবং শেষ পর্যন্ত রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা।
সুলতান আল আরাদা সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সাবাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর সাম্প্রতিক পরাজয়কে বেদনাদায়ক ও দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তাঁর দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের ধাক্কা অস্বাভাবিক নয়। উপকূল থেকে সরে আসা সেনাদের পুনর্গঠন শেষ হলে তাঁদের আবার বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাঠানো হবে।
ইয়েমেনে গত কয়েক সপ্তাহে সংঘাত দ্রুত তীব্র হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে। এর মধ্যে মোখা বন্দরনগরী এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের কৌশলগত এলাকাও রয়েছে। এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
হুথিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী দেশের বিভিন্ন ফ্রন্টে পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে। তায়েজ, হোদেইদা, আল জাওফ, মারিব ও আল বাইদা এলাকায় বিমান হামলার পাশাপাশি স্থলবাহিনীর লড়াইও তীব্র হয়েছে। সরকারি বাহিনী কয়েকটি এলাকায় অগ্রগতির দাবি করলেও হুথিরাও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক লড়াইকে কয়েক বছরের মধ্যে ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারি বাহিনীর নেতৃত্ব বলছে, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু হারানো উপকূলীয় অঞ্চল পুনরুদ্ধার নয়, রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণও ফিরে পাওয়া। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আল জাওফ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অঞ্চলটি সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি এবং হুথিদের প্রধান ঘাঁটি সাদার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে। ফলে সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সরকারি বাহিনী হুথিদের ওপর সামরিক চাপ বাড়াতে পারবে।
তবে সামরিক ভারসাম্য এখনো স্পষ্টভাবে সরকারি বাহিনীর দিকে ঝুঁকেছে এমনটি বলা যাচ্ছে না। হুথিরা রাজধানী সানা ও দেশের বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা লোহিত সাগর উপকূলেও দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাব আল-মান্দাবের কাছে হুথিদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে পশ্চিম ইয়েমেনের কয়েক দশক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, সংঘাত বাড়ার সঙ্গে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং নিরাপদ মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ ২০১৪ সালে হুথিদের সানা দখলের পর নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। ২০১৫ সালে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘাত কিছুটা স্তিমিত থাকলেও সাম্প্রতিক লড়াই সেই বিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গবেষণা বিভাগও সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালে সংঘাত তীব্র হয়ে আবার বড় আকারের যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
ফলে উপকূল থেকে সরে আসা সরকারি বাহিনীকে পুনর্গঠন করে নতুন স্থলযুদ্ধে নামানোর পরিকল্পনা ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে আরেকটি বড় বাঁক তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু ইয়েমেনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা ও লোহিত সাগরের নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
