দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন করে স্থিতিশীল করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাণিজ্য বৃদ্ধি, যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত উত্তেজনার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে নেমে গেলেও এখন ধীরে ধীরে যোগাযোগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শির এই ভারত সফর সাত বছর পর প্রথম। বৈঠকটিকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা সাংস্কৃতিক বিনিময়, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং মানুষের মধ্যে চলাচল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি কাঠামোগত বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয় সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
চীনের সরকারি বক্তব্যেও সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন শি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে ফিরছে, সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ছে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়লেও ভারসাম্যহীনতা ভারতের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে আছে। চীনা শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রেকর্ড প্রায় ১৫ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এর মধ্যে ভারতের চীন থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার। বিপরীতে চীনে ভারতের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি হয়েছে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি সীমান্ত শান্তি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভয়াবহ সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। দুই দেশের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বড় অংশ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত নয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে সীমান্তে সামরিক অচলাবস্থা কমাতে দুই দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপর ধীরে ধীরে সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়তে থাকে। তবে সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
মোদী বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সীমান্তসংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতা মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে সম্পর্কের এই উষ্ণতা এখনো সতর্কতার পর্যায়ে রয়েছে। সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য ঘাটতি, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের বড় কারণ হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে সীমান্ত বিরোধ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার বাস্তব সমাধানের ওপর।
শি-মোদির এবারের বৈঠক তাই কেবল দুই নেতার কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময় নয়। এ বৈঠক এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সীমান্ত স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কতটা স্থায়ী হবে তা নির্ভর করবে আগামী দিনে দুই দেশের বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।
