দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
সারা দেশে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে ঘিরে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আবেদনকারীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের তদবিরের অভিযোগ উঠেছে। ৪ হাজার ৯৩১টি ডিলারশিপের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে আগ্রহ ও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তদবির কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সার বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত ৩০ আগস্ট সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা ২০২৬ বাস্তবায়নের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নীতিমালার লক্ষ্য হিসেবে সার বিতরণে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ৪ হাজার ৯৩১টি নতুন ডিলারশিপের বিপরীতে প্রায় ৪৬ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি ডিলারশিপের জন্য গড়ে প্রায় ৯ থেকে ১০ জন আবেদন করেছেন। কোনো কোনো এলাকায় একটি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা আরও বেশি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করার চেষ্টা চলছে। কোথাও কোথাও ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অর্থ দাবি করার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সরকারি তদন্তে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে এমন অভিযোগের মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করেই আবেদন যাচাই করা হচ্ছে। কৃষি সচিব সেলিম খান জানিয়েছেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে আসা আবেদনগুলো সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে। চূড়ান্ত নিয়োগে যোগ্য আবেদনকারীকেই নির্বাচন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
নীতিমালা অনুযায়ী প্রথমে জেলা সার ও বীজ পর্যবেক্ষণ কমিটি আবেদন যাচাই করবে। এরপর আবেদনগুলো উপজেলা পর্যায়ের কমিটির কাছে পাঠানো হবে। উপজেলা কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। জেলা পর্যায়ে পুনরায় যাচাইয়ের পর ওই তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি যাচাই শেষে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একজনকে মনোনীত করবে।
এই ব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ে কমিটির সভাপতি হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ফলে আবেদন যাচাই থেকে প্রার্থী বাছাই পর্যন্ত মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম ঠেকাতে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারিও বাড়িয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ৬৪ জেলার জন্য অকৃষি সার হিসেবে ব্যবহৃত টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদার শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর আগে সার বিতরণে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট ও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে নতুন ডিলার নিয়োগ ঘিরে পুরোনো ডিলারদের অবস্থান এবং কমিশন নিয়েও আলাদা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সার ডিলারদের সংগঠন কমিশন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে এবং নতুন ডিলার নিয়োগ স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুলসংখ্যক আবেদন থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা এবং রাজনৈতিক কিংবা আর্থিক প্রভাবের অভিযোগ থেকে প্রক্রিয়াটিকে মুক্ত রাখা। কারণ সার সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও খাদ্য নিরাপত্তা জড়িত। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত যোগ্যতার কঠোর প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
