দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
পিরোজপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে মৃত্যুর প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর পুলিশি নিরাপত্তায় দাফন করা হয়েছে। তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও দাফন নিয়ে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। তবে দলটির স্থানীয় নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী শনিবার সকালে মারা যান। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি সেখানে তাঁর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের কাছে আশ্রয়ে ছিলেন।
শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মানে গার্ড অব অনার দেওয়ার আয়োজন এবং নিজ এলাকায় দাফন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন স্বজনেরা।
মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার বলেন, ভাইয়ের মরদেহ দাফনের জন্য পিরোজপুরে আনার পর তাঁরা বিপাকে পড়েন। পরিবারের অভিযোগ, জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা গার্ড অব অনার দেওয়া এবং পিরোজপুরে দাফনের বিরোধিতা করেন।
পরিস্থিতির মধ্যে পিরোজপুর জেলা পুলিশের সহায়তায় মরদেহটি পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়। সেখানে শনিবার বিকেল ৫টার দিকে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর পুলিশি নিরাপত্তায় মরদেহটি রাখা হয়।
মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের অভিযোগ, উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য মরদেহ নেওয়ার পর বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। পরে পুলিশ লাইনসে গোপনে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয় এবং মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক এর আগে মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরে তাঁর মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না।
তবে দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জেলা জামায়াত বা এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কোনো বাধা দেননি। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের নেতারা লাশ নিয়ে রাজনীতি করেন না এবং দাফন সম্পন্ন করতে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন।
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না। তাঁর দাবি, আপত্তি ছিল একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে। তিনি মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তবে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে জামায়াত নেতাদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পুলিশের নিরাপত্তায় মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাঁর কবরের পাশেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মানিক পশারী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। ওই মামলায় সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মানিক পশারীর মরদেহ দাফন নিয়ে তৈরি হওয়া এই ঘটনা মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
