দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার পাহাড়ি জনপদ ঈদগড়ের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ঈদগড় বাজারে ডাকাত আতঙ্কে বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ঈদগাঁও–ঈদগড়–বাইশারী সড়কে সাম্প্রতিক গণডাকাতির পর বাজারে ক্রেতা ও পাইকারের উপস্থিতি কমে গেছে। এতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ী।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতি শুক্রবার ঈদগড় বাজারে প্রায় চার কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হতো। কিন্তু গত ১৯ অক্টোবর সড়কে দুই দফা ডাকাতির ঘটনার পর গত শুক্রবারের হাটে বেচাকেনা কমে প্রায় দুই কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাজারের চার শতাধিক দোকানে শাকসবজি, মাছ, মুরগি, ডিম, ধান, চাল, কাপড়চোপড়, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়।
বাজার কমিটির সভাপতি নুরুল হুদা জানান, সপ্তাহে শুক্র ও সোমবার বাজারে হাট বসে। আগে শুক্রবারের হাটে গড়ে চার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও ডাকাতির পর তা অর্ধেকে নেমেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শত বছরের পুরোনো এ বাজার শুধু রামু নয়, আশপাশের কয়েকটি উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীদেরও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর ও ঈদগাঁও থেকে পাইকারেরা এখানে এসে কৃষিপণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। ডাকাত আতঙ্কে তাঁদের অনেকে এখন বাজারে আসছেন না।
গত শুক্রবার বাজারে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজিতে দোকান ও বাজারের বিভিন্ন অংশ ভরপুর থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজার জমজমাট থাকত। এখন বিকেল তিনটার আগেই বাজার অনেকটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
গর্জনিয়া ইউনিয়নের বোয়াংখিল গ্রামের কৃষক মো. তারেক ৪০ শতক জমিতে আগাম মুলার চাষ করেছেন। শুক্রবার সকালে খেত থেকে দুই মণ মুলা তুলে বাজারে আনলেও বিকেল চারটা পর্যন্ত বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ২০ কেজি। কয়েক দিন আগে যে মুলা প্রতি কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন, ক্রেতার অভাবে সেই মুলা এবার ২০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে।
মাছ ব্যবসায়ীরাও লোকসানের মুখে পড়েছেন। ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, গত শুক্রবার বিক্রির জন্য তিন মণ পাঙাশ, তেলাপিয়া ও রুই মাছ এনেছিলেন। দুপুর দুইটা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল মাত্র এক মণ। বাকি মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি।
ঈদগড়ের একটি স্বয়ংক্রিয় চালকলে গিয়ে দেখা যায়, ১২০ বস্তা চাল মজুত রয়েছে। মিলের মালিক আবুল কাশেম বলেন, আগে প্রতি শুক্রবার তাঁর মিল থেকে অন্তত ১০০ বস্তা চাল কিনতেন কক্সবাজার, মহেশখালী ও ঈদগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা। গত শুক্রবার বিক্রি হয়েছে মাত্র চার বস্তা। বাজারের আরও ১৪টি চালকলে প্রায় দেড় হাজার বস্তা চাল জমে থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঈদগড়, গর্জনিয়া ও বাইশারী এলাকায় ধান, শাকসবজি ও কলার চাষের পাশাপাশি রাবার বাগান রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে পণ্য পরিবহন ও বিক্রি ব্যাহত হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঈদগাঁও–ঈদগড়–বাইশারী সড়কটি প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই সড়ক কক্সবাজারের ঈদগাঁও ও রামু উপজেলার সঙ্গে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী এলাকার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
গত ১৯ অক্টোবর সকালে ও দুপুরে সড়কের হিমছড়ি ঢালা এলাকায় দুই দফা ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মুখোশধারী সশস্ত্র ব্যক্তিরা যানবাহনের গতিরোধ করে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা, মুঠোফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৫০ থেকে ৬০টি যানবাহন আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে যানবাহনের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনভেদে পার্থক্য রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এ সড়কে দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। সন্ধ্যার পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঈদগাঁও, ঈদগড়, গর্জনিয়া ও বাইশারী এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সড়কে নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি স্থায়ী যৌথ তল্লাশিচৌকি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। ঈদগড় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, সাম্প্রতিক গণডাকাতির পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। অপরাধ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি জরুরি।
ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ টি এম সিফাতুল মাজদার জানিয়েছেন, সড়কের বনাঞ্চলে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং লুণ্ঠিত কিছু টাকা, মুঠোফোন ও অলংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, সড়কের আশপাশে কয়েকটি ডাকাত দলের আস্তানা রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সড়কে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের অনুমোদন পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদগড় বাজারের বেচাকেনা ও কৃষিপণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, শুধু টহল বাড়ানো নয়, সড়কে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও জরুরি।
সূত্রঃ প্রথম আলো
