দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । যুগের গল্প ।
উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর প্রাচীন শহর ফেজ। পাহাড়ঘেরা এই শহরের পুরোনো অংশের সরু ও আঁকাবাঁকা গলিতে আজও ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলাচল করতে পারে না। পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াতে সেখানে গাধা ও গরুর গাড়ির ব্যবহার এখনও চোখে পড়ে।
শহরের উঁচু কোনো স্থান থেকে ফেজের কেন্দ্রের দিকে তাকালে দর্শনার্থীদের চোখে প্রথমেই পড়ে সবুজ সিরামিক টালিতে মোড়ানো অসংখ্য ছাদ। এসব ছাদের নিচেই প্রায় ১২ শতক ধরে জ্ঞানের চর্চা করে আসছে আল-কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়।
৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানকে ইউনেস্কো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এখনও চালু থাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাকেন্দ্র থাকলেও সেগুলোর কোনোটি বর্তমানে কার্যকর নেই। এই পার্থক্যটিই আল-কারাউইয়্যিনকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটির গোড়াপত্তন করেছিলেন একজন মুসলিম নারী। তাঁর নাম ফাতিমা আল-ফিহরি।
ফাতিমা আল-ফিহরি কে ছিলেন
ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রধান তথ্যগুলোর অনেকটাই এসেছে চতুর্দশ শতকে ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের লেখা ‘রাওয আল-কিরতাস’ গ্রন্থ থেকে।
ধারণা করা হয়, ফাতিমার জন্ম আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে। তাঁর পুরো নাম ছিল ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরি আল-কুরাইশিয়া। তাঁর বাবা মুহাম্মাদ আল-ফিহরি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং আরবের কুরাইশ বংশের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
ব্যবসায়িক কারণে ফাতিমার পরিবার উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করত। একসময় তাঁর বাবা মরক্কোয় পাড়ি জমান এবং পরে পরিবার নিয়ে ফেজ শহরে বসতি স্থাপন করেন। বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখানে উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হন।
শৈশব থেকেই ফাতিমা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি তিনি ফিকাহ, ভাষা ও অন্যান্য জ্ঞানচর্চায়ও আগ্রহী ছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়।
বিয়ের কয়েক বছর পর ফাতিমা স্বামীকে হারান। অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর বাবা ও ভাইও মারা যান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পদের মালিক হন ফাতিমা ও তাঁর বোন মারিয়াম আল-ফিহরি।
সম্পদ ব্যয়ের ভিন্ন সিদ্ধান্ত
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থ ব্যক্তিগত বিলাসে ব্যয় না করে জনকল্যাণে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন। ফেজে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় তাঁরা সেখানে বড় মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
মারিয়াম আল-ফিহরি তাঁর সম্পদের বড় অংশ ব্যয় করে নির্মাণ করেন আল-আন্দালুস মসজিদ। অন্যদিকে ফাতিমা আল-ফিহরি নির্মাণ করেন একটি বৃহৎ মসজিদ, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল ইসলামি শিক্ষার জন্য একটি মাদ্রাসা।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হিজরি ২৪৫ সালের ১ রমজান—৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে—এই স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মসজিদের মূল ভবন নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লাগলেও পুরো কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হতে আরও অনেক বছর সময় লেগেছিল।
ইবনে আবি জারের বর্ণনা অনুযায়ী, ফাতিমা নিজেই নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারক করতেন। এমনকি কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি রোজা রেখেছিলেন বলেও ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। তবে এ ধরনের বিবরণ মূলত পরবর্তী সময়ের ঐতিহাসিক গ্রন্থনির্ভর; তাই এগুলোকে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে দেখা হয়।
ফাতিমার জন্মস্থান কাইরুয়ানের নাম অনুসারে মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্রটির নাম রাখা হয় ‘আল-কারাউইয়্যিন’। ফেজের ওই এলাকায় কাইরুয়ান থেকে আসা মানুষের বসতি ছিল বলেও নামটির সঙ্গে সেই সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়।
মসজিদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার শুরুতে আল-কারাউইয়্যিন ছিল মসজিদ, মাদ্রাসা ও গ্রন্থাগারকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি জ্ঞানকেন্দ্র। ধীরে ধীরে এটি উত্তর আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
প্রথম দিকে এখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্রের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়—
-
আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ;
-
আইন ও দর্শন;
-
গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান;
-
চিকিৎসাবিজ্ঞান;
-
সঙ্গীত;
-
সুফিবাদ ও ইতিহাস।
মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে ইহুদি ও খ্রিস্টান শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়াশোনা করেছেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ইউরোপীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টারও আল-কারাউইয়্যিনে পড়াশোনা করেছিলেন বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তবে তাঁকে ঘিরে থাকা এই দাবির ঐতিহাসিক প্রমাণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, আনুমানিক একাদশ থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে আল-কারাউইয়্যিন একটি আনুষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ দেওয়ার প্রথাও তখন চালু হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার
আল-কারাউইয়্যিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার। এখানে মধ্যযুগের হাতে লেখা ২০ হাজারের বেশি বই ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ইসলামী ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইমাম মালিক ইবনে আনাসের ‘আল-মুআত্তা’, ইবনে ইসহাকের ‘আস-সিরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ’ এবং ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের কপি বা পাণ্ডুলিপি।
গ্রন্থাগারটির আধুনিক সংস্কারকাজ ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এ সময় ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আধুনিক গবেষণাগারও স্থাপন করা হয়।
গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ সংগ্রহের একটি অংশ রাখা হয় ষোড়শ শতকের একটি নিরাপদ ভল্টে। ভল্টটির তামার দরজায় চারটি তালা রয়েছে, যা খুলতে চারজন আলাদা চাবিধারীর প্রয়োজন হয় বলে জানা যায়।
আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর
আল-কারাউইয়্যিনের ইতিহাসে সময়ের সঙ্গে বহুবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে। ৯৫৬ সালে কর্ডোবার শাসক তৃতীয় আবদুর রহমানের সময় মসজিদটির বড় ধরনের সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ ও ষোড়শ শতকেও এর আয়তন বাড়ানো হয়।
বর্তমানে মসজিদটি আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসেবে বিবেচিত। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২২ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মরক্কো সরকার ১৯৬৩ সালে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। ১৯৬৫ সালে এর নামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি যুক্ত হয়।
ইতিহাসে ফাতিমার উত্তরাধিকার
আল-কারাউইয়্যিনের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে নবম শতকে এটি আধুনিক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল কি না এবং ফাতিমা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কি না—এসব বিষয়ে গবেষকদের আলোচনা আছে।
তবে এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, ফাতিমা আল-ফিহরির অর্থায়নে ৮৫৯ সালে ফেজে একটি মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। বর্তমানে আল-কারাউইয়্যিনকে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ধারাবাহিকভাবে চালু থাকা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়।worldhistory+1
ফাতিমার গল্প তাই শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি এমন এক মুসলিম নারীর দৃষ্টান্ত, যিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যক্তিগত ভোগে নয়, শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান ও মানবকল্যাণে ব্যয় করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগের ফল আজও মরক্কোর ফেজ শহরে জ্ঞানচর্চার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
