লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

শেকড় থেকে শপথে: একাত্তর থেকে চব্বিশে

প্রকাশিত: 01 জুলাই 2026

36 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে যা শুধু ঘটনা নয়, সেগুলো হয়ে ওঠে জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সাল এমনই এক মুহূর্ত, যার সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো ঘটনার তুলনা চলে না। কারণ এটি কোনো সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, ছিল না কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল। এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই, ভাষা সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অধিকার আদায়ের লড়াই, যেখানে ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে শুধু এই অধিকারের জন্য যে আমরা বাঙালি, আমাদের নিজস্ব একটি ভূখণ্ড থাকার অধিকার আছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মের নজির খুব কম আছে। তাই একাত্তরকে অন্য কোনো আন্দোলনের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টাই একটা ভুল প্রস্তাবনা, কারণ একাত্তর তুলনার ঊর্ধ্বে, একাত্তর আমাদের শেকড়।

কিন্তু শেকড় থাকলেই গাছ বেঁচে থাকে না, তাকে রক্ষা করতে হয় প্রতিনিয়ত। ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঠিক এই রক্ষা করার গল্প। যখন একটি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের আজ্ঞাবহ বানিয়ে ফেলেছিল, যখন ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যখন ভিন্নমত মানেই গুম খুন আর মামলার ভয় দেখানো হতো, তখন আবারও রাস্তায় নেমে এসেছিল আপামর জনসাধারণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্র – শিক্ষক রিকশাচালক দিনমজুর সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল একটাই দাবি নিয়ে, দেশটা আবার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এটি প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের মানুষ এখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখেনি। বৈদেশিক আধিপত্যবাদ আর অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদের যৌথ চাপের বিরুদ্ধে এই গণজাগরণ ছিল জাতির আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার শেষ প্রাচীর।

তবে এখানেই একটা প্রশ্ন উঠে এসেছে যা নিয়ে কথা বলাটা জরুরি। কারা চাইছে ২০২৪ কে ১৯৭১ এর মুখোমুখি দাঁড় করাতে? কেন বারবার এই দুই আন্দোলনকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে নানান গণমাধ্যমে আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বেরিয়ে আসে একটা সুপরিকল্পিত বয়ান তৈরির চেষ্টা। যারা একাত্তরের চেতনাকে নিজেদের রাজনৈতিক পুঁজি বানিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিল, তাদের জন্য চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান একটা অস্বস্তিকর সত্য, কারণ এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করে দিয়েছে চেতনার নামে কুক্ষিগত করা ক্ষমতা এদেশের জনগণ আর মেনে নেয় না। তাই তাদের কৌশল হলো চব্বিশকে বিতর্কিত করা, একে একাত্তরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়ে এমন একটা ভুয়া দ্বন্দ্ব তৈরি করা যাতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, যাতে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এই ষড়যন্ত্রের লক্ষ্য একটাই, জাতির নতুন জাগরণকে দুর্বল করে দেওয়া যাতে বিদেশী প্রভুদের আজ্ঞাবহ পুরোনো ফ্যাসিবাদী শোষণের কাঠামো আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো একাত্তর আর চব্বিশ কখনো একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। একাত্তর ছিল একটি জাতির জন্মের ইতিহাস, যেখানে আপামর বাংলার মানুষ প্রথমবারের মতো নিজের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছিল। আর চব্বিশ হলো সেই জাতিকে মাথা উঁচু করে নিজের সার্বভৌমত্ব ও স্বকীয়তা বজায় রেখে বাঁচতে শেখানোর প্রতিশ্রুতি। একটি জন্ম দিয়েছে, আরেকটি শিখিয়েছে কীভাবে বেড়ে উঠতে হবে, কিভাবে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হয় প্রতিনিয়ত সতর্কতার মধ্য দিয়ে। দুটি আন্দোলনেই একটা জিনিস অভিন্ন, গণমানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়ানো অপশক্তির পরাজয় আর সাধারণ মানুষের বিজয়। একাত্তরে পরাজিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শোষণ আর বৈষম্য, চব্বিশে পরাজিত হয়েছে স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র ও বিদেশী প্রভুর আজ্ঞাবহ দাসেরা। দুটোতেই বিজয়ী হয়েছে একটাই শক্তি, সাধারণ মানুষের ন্যায়সঙ্গত আকাঙ্ক্ষা।

এখন প্রশ্ন হলো সামনের পথ কী। জুলাই আগস্টের সেই অনুপ্রেরণাকে শুধু একটা স্মৃতি বানিয়ে রাখলে চলবে না, একে ধারণ করতে হবে জাতির প্রতিদিনের চেতনায়। কারণ ফ্যাসিবাদ কখনো একবারে শেষ হয়ে যায় না, সে বারবার নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করে, কখনো গুজব আর অপপ্রচারের মুখোশে, কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো আবার পুরোনো চেতনার দোহাই দিয়ে। চব্বিশের শিক্ষা যদি জাতি ভুলে যায়, তাহলে আবারও কোনো না কোনো রূপে স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসার সুযোগ পাবে। তাই আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে, ভবিষ্যতের যেকোনো ফ্যাসিবাদী প্রচেষ্টা রুখে দিতে হলে, একাত্তরের আত্মত্যাগ আর চব্বিশের প্রতিরোধ দুটোকেই সমানভাবে বুকে ধারণ করতে হবে এই জাতিকে। এই দুটি অধ্যায় একসঙ্গেই বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, কোনোটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বোঝার চেষ্টা আসলে নিজের শেকড়কেই অস্বীকার করার শামিল।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman