দ্য সিভিলিয়ানস । বিনোদন । আবু মো. মাছানী ।
সিনেমা সবসময়ই একটি জাতির সময়কাল, সমাজব্যবস্থা ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটি আদর্শ চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং তা সময়ের পরিবর্তনের হাতিয়ার, সংস্কৃতির রূপান্তর এবং সমাজে নারীর অবস্থান ও সংগ্রামকে সঠিকভাবে তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষ করে নারীরা যেসব নতুন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন, পারিবারিক ও সামাজিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে যেভাবে তারা দাঁড়াচ্ছেন—এসব বিষয় চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। এটা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু আফসোস। তেমন উদ্দ্যেগ এখন আর দেখিনা অনেকদিন থেকেই ।
অন্য দেশের সিনেমাতে আমরা দেখি এক সময় যেসব তারকারা কেবল অলংকার বা শুধু শোপিস হিসাবে উপস্থাপিত হতো, ধীরে ধীরে তারা শক্তিশালী, প্রতিবাদী ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন চরিত্রে অভিনয় করছে। খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। পাশের দেশ ভারতকে দেখলেই বুঝা যায়। এখনো মাধুরী, রানি মুখার্জী, তাপসী পান্নু, বিদ্যা বালান, দীপিকা বা কারিনারা অথবা কলকাতায় ঋতুপর্ণা, স্বস্তিকা এমনকি হারানো দিনের অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর, রাখী এখনো শক্তিশালী নারী চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছেন। সেখানকার পরিচালকরা তাদের নারীকেন্দ্রিক ছবিগুলোকে কাস্ট করছেন।
শুধু ব্যতিক্রম আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে আজ নারী-কেন্দ্রিক সিনেমা ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছে। এক সময় হয়তো এটা জাদুঘরে স্থান পাবে। কিন্তু পরিস্থিতি সবসময় এরকম ছিল না। গত শতকের সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমাদের বাংলা সিনেমার দর্শকরা উপভোগ করেছেন অসংখ্য নারী-নির্ভর ও নারীপ্রধান চলচ্চিত্র। সেসব সিনেমা মুক্তির পর শুধু সুপারহিটই হয়নি, দেশ-বিদেশ থেকে এনেছে সম্মানজনক পুরস্কারও।
এসব কারণে আমাদের ববিতা কিন্তু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকার খেতাব পেয়েছেন। দর্শকের মনে আজও অম্লান হয়ে আছে গোলাপী (ববিতা), যিনি তার দল বলসহ ট্রেনে ট্রেনে আটা বিক্রি করত; জরিনা (শাবানা), যে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছিল; নবিতুন (কবরী), যে নাবিক স্বামীর অনুপস্থিতিতে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল; কিংবা জয়গুণ (ডলি আনোয়ার)—অদম্য চার নারী চরিত্র। তারা এখনো স্মৃতিতে অম্লান। কারণ তারা তখন ওইসব কালজয়ী চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিল এবং উজাড় করে অভিনয় করেছিল।
যারা এই শতাব্দীতে জন্মেছেন, তারা হয়তো এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নন। অথচ “গোলাপি এখন ট্রেনে”, “ভাত দে”, “সারেং বউ” ও “সূর্য দীঘল বাড়ি”—এই চারটি চলচ্চিত্রে চারজন শক্তিমান নারী চরিত্র আমাদের সিনেমার ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
আজকাল খুব কমই দেখা যায় এমন চলচ্চিত্র, যেখানে নারীরা সামাজিক ন্যায়বিচার বা লিঙ্গসমতার প্রশ্নে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছে। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, এটি সমাজের সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং নারীরা জীবনের প্রতিটি স্তরে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন—তার দলিল।
আজকের নারীরা পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও নির্ধারিত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। যদিও ধীরে ধীরে নারী চরিত্রের গুরুত্ব কিছুটা বেড়েছে, তবু ঢালিউডে নারী-কেন্দ্রিক সিনেমা নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। নারীদের প্রায়ই দুর্বল, নির্ভরশীল ও অসহায় হিসেবে দেখানো হয় এখনকার সিনেমাগুলোতে, যা সমাজে প্রচলিত লিঙ্গবৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে।

এক সময় আমাদের ছিল সুভাষ দত্ত, আমজাদ হোসেন, আলমগীর কবির, মসিউদ্দিন শাকের, শেখ নিয়ামত আলী, চাষী নজরুল ইসলাম, আজিজুর রহমান ও আবদুল্লাহ আল মামুনের মতো অনেক শক্তিশালী পরিচালক। তাঁদের নির্মিত চলচ্চিত্রে নারী চরিত্র ছিল দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন—যেমন “সূর্য দীঘল বাড়ি”-র জয়গুণ, “সারেং বউ”-এর নবিতুন, “গোলাপি এখন ট্রেনে”-র গোলাপী, “ভাত দে”র জরিনা, “সখিনার যুদ্ধ”-এর সখিনা, “পদ্মা নদীর মাঝি”-র মালা কিংবা “আলোর মিছিল”-এর আলো। এসব চলচ্চিত্র ও তাদের নির্মাতারা দেশ ও জাতিকে এনে দিয়েছেন গৌরব ও সম্মান। আজ সেই দিনগুলো যেন অতীত।
একবিংশ শতাব্দীর ২৫ বছর পার হলেও আমরা হাতে গোনা কয়েকটি নারীপ্রধান চলচ্চিত্র পেয়েছি—যেমন “মাতৃত্ব”, “মেঘলা আকাশ”, “মেঘের কোলে রোদ”, “পালাবি কোথায়”। যদিও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে—“শঙ্খচিল”, “মেহেরজান”, “বিসর্জন”, মারিয়াম্ নুর, “আন্ডার কনস্ট্রাকশন”, “দেবী”—তবু সংখ্যাটি আশানুরূপ কোনোভাবেই বলা যাবেনা। অন্যদিকে বলিউড ও টালিগঞ্জে নিয়মিতভাবেই নারী-কেন্দ্রিক সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। নারী প্রধান সিনেমা প্রায়শই বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়ায় প্রযোজকেরা আগ্রহ হারান।
পুরুষ শাসিত চলচ্চিত্র সংস্কৃতিও এই প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে। অথচ নারীকেন্দ্রিক সিনেমা সমাজে লিঙ্গসমতা, নারীর সংগ্রাম ও অধিকারকে তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ইদানিং কিছু তরুণ পরিচালক নারীকেন্দ্রিক কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছেন। যেমন “বনলতা এক্সপ্রেস”, “প্রেশার কুকার”,”বনলতা সেন” সহ কিছু ছবি। একসময় আমাদের ছিল কবরী, ববিতা, শাবানা, রোজিনা, সুচরিতা, চম্পা, সুবর্ণা, শাবনূর, পপি, শাবনাজ, মৌসুমী, পূর্ণিমার মত জনপ্রিয় এবং মেধাবী অভিনেত্রী। তেমনি এখন আছে বাঁধন, মম, পরীমনি, বুবলি আর তমা মীর্জা’ র মতো সুন্দরী এবং মেধাবী নায়িকা, যারা তাদের অগ্রজদের মত নারী কেন্দ্রিক ছবিকে রিপ্রেজেন্ট করবে।
কারণ এদেরও সেই মেধা আছে এবং ইতিমধ্যে সেটা প্রস্ফুটিত হয়েছে। আমাদের তরুণ মেধাবী পরিচালকরাই এদের আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আজ শুধুই প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সাহসী উদ্যোগ ও বিনিয়োগ। সিনেমা হল কমে গেলেও, ভালো গল্প ও শক্তিশালী নারীকেন্দ্রিক আখ্যানই পারে আবার সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার করে তুলতে। প্রশ্ন একটাই—এই নেতৃত্ব কে নেবে?
আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী দেখলাম হলে গিয়ে ছবি দেখলেন মেয়ের সাথে। এটা আমাদের আশান্বিত করে। অনেকেই সিনেমা হলে যেতে উৎসাহিত হবে।মনে হবে আমরা একটা সিনেমা বান্ধব সরকার পেতে চলেছি। যে সরকার ডুবে যাওয়া এই ইন্ডাস্ট্রিকে আবার তুলে ধরার কাজে হাত দিবে। মোবাইলের যুগে পৃথিবীর সব দেশে সিনেমা চালু আছে শুধু আমাদের দেশে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেনো সংস্কৃতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরছে। দর্শকদের আবার হলে ফিরানোর জন্য যা কিছু করা দরকার আমার আশা এই সরকার সেটার দিকে মনোযোগী হবেন।
| লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক |
