দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ উপকূলসংলগ্ন এলাকায় জেলেদের জালে ধরা পড়া একটি রহস্যময় যন্ত্র ঘিরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে প্রশাসন, গবেষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে উদ্ধার হওয়া প্রায় আট ফুট দীর্ঘ লাল ও হলুদ রঙের যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক যানের মতো। প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এটি স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের গবেষণা যান হতে পারে।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে চরদুয়ানী ইউনিয়নসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের মোহনা এলাকায় মাছ ধরার সময় তাঁদের জালে অস্বাভাবিক ভার অনুভূত হয়। প্রথমে বড় কোনো সামুদ্রিক মাছ আটকা পড়েছে বলে ধারণা করা হলেও জাল তোলার পর দেখা যায়, সেটি একটি যান্ত্রিক বস্তু।
জেলে মিরাজ হোসেন জানান, জীবনে আগে কখনো এমন যন্ত্র দেখেননি তাঁরা। যন্ত্রটির ভেতরে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এবং পাখার মতো অংশ দেখতে পেয়ে অনেকেই প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে সেটি ট্রলারে করে পাথরঘাটায় নিয়ে এসে প্রশাসনকে অবহিত করা হয়।
উদ্ধার হওয়া যন্ত্রটির ছবিতে দেখা যায়, এটি দীর্ঘ নলাকার আকৃতির। এর পেছনে স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী পাখা রয়েছে। ভেতরে রয়েছে ব্যাটারি ইউনিট, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ প্রযুক্তিসংবলিত বিভিন্ন অংশ। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশেষজ্ঞরা এটিকে সমুদ্র গবেষণায় ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় যান বলে মনে করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এটি স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের গবেষণা যান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাঁর মতে, যান্ত্রিক ত্রুটি, শক্তির ঘাটতি কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে এটি সাগরের স্রোতে ভেসে বাংলাদেশের উপকূলে চলে এসে থাকতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, আবহাওয়া সংস্থা এবং সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান নিয়মিত এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি, পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে এসব যানের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যন্ত্রটির প্রকৃত পরিচয় জানতে এর সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের তথ্য, অভ্যন্তরীণ তথ্যভান্ডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে জানা যেতে পারে এটি কোন দেশের, কত দিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল।
এই যন্ত্রটি কোন দেশের বা করা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করছিল, বাংলাদেশের জলসীমায় যন্ত্রটি কি ধরণের মিশন পরিচালনা করছিল এবং কি ধরণের তথ্য এটি সংগ্রহ করছিল তা জানাটাও বেশ জরুরী। এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসম্য বিনষ্ট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি কি না তাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করছেন বিশেষজ্ঞগণ।
পাথরঘাটা থানা পুলিশ জানিয়েছে, যন্ত্রটি নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, যদি এটি সত্যিই একটি স্বয়ংক্রিয় গবেষণা যান হয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশের উপকূলে এমন প্রযুক্তি উদ্ধার একটি বিরল ঘটনা। একই সঙ্গে এটি বঙ্গোপসাগরে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র গবেষণা, সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পর্কেও নতুন আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
