দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বোর্ডের ১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। বিপরীতে শতভাগ পাসের সাফল্য অর্জন করেছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে এমন বিপর্যয় অন্যদিকে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় বোর্ডের শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলের পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। বোর্ডের সার্বিক ফলাফলেও হতাশার চিত্র দেখা গেছে। এ বছর যশোর বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৭৯১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫০ হাজার ৬৬৮ জন। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
গত চার বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ওঠানামা করলেও শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
২০২৩ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল সাতটি। ওই বছর শতভাগ পাস করেছিল ১০টি প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালেও শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সাতটিই ছিল। তবে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩টিতে।
পরবর্তী বছর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ২০২৫ সালে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০টিতে। বিপরীতে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে পাঁচটিতে নেমে আসে।
২০২৬ সালে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিছুটা কমে ১৬ হলেও শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও কমে মাত্র তিনটিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত দুই বছরে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
যেসব ১৬ প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেননি
বোর্ডের ফলাফলে শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের তালিকায় খুলনা বিভাগের ছয় জেলার কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
তালিকা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
১. কুষ্টিয়ার হাজী নুরুল ইসলাম কলেজ, পরীক্ষার্থী ৮ জন।
২. মেহেরপুরের মোরকা জাগরণ কলেজ, পরীক্ষার্থী ১ জন।
৩. ঝিনাইদহের মল্লিক শহিদুল ইসলাম কারিগরি কলেজ, পরীক্ষার্থী ১৯ জন।
৪. খুলনার মডেল মহিলা কলেজ, পরীক্ষার্থী ৩ জন।
৫. মাগুরার বুজরুক শ্রীকুন্দি কলেজ, পরীক্ষার্থী ১৫ জন।
৬. যশোরের সবুজ পল্লী কলেজ, পরীক্ষার্থী ৭ জন।
৭. খুলনার ইনডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজ, পরীক্ষার্থী ১১ জন।
৮. সাতক্ষীরার ইসলামিয়া মহিলা কলেজ, পরীক্ষার্থী ৩ জন।
৯. কুষ্টিয়ার জগন্নাথপুর আইডিয়াল কলেজ, পরীক্ষার্থী ১ জন।
১০. মাগুরার গোপিনাথপুর এম এ খালেক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পরীক্ষার্থী ২ জন।
১১. খুলনার কপিলমুনি সহচারী বিদ্যা মন্দির, পরীক্ষার্থী ৩ জন।
১২. খুলনার কয়রা শাকবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পরীক্ষার্থী ২৭ জন।
১৩. কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস কলেজ, পরীক্ষার্থী ১ জন।
১৪. নড়াইলের মাকরাইল করিম খালেক সোলায়মান ইনস্টিটিউট, পরীক্ষার্থী ৪৩ জন।
১৫. খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পরীক্ষার্থী ১২ জন।
১৬. সাতক্ষীরার এ কে ফজলুল হক এমসিএ কলেজ, পরীক্ষার্থী ৪৯ জন।
তালিকায় সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ছিল সাতক্ষীরার এ কে ফজলুল হক এমসিএ কলেজে। সেখানে ৪৯ জন পরীক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। নড়াইলের মাকরাইল করিম খালেক সোলায়মান ইনস্টিটিউট থেকে ৪৩ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কেউ পাস করতে পারেননি। একইভাবে খুলনার কয়রা শাকবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৭ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
অন্যদিকে মাত্র একজন করে পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এগুলো হলো মেহেরপুরের মোরকা জাগরণ কলেজ, কুষ্টিয়ার জগন্নাথপুর আইডিয়াল কলেজ এবং কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস কলেজ।
শূন্য পাসের বিপরীতে শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ, পরীক্ষার্থী ৪৩ জন; বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খুলনা, পরীক্ষার্থী ৬১ জন এবং চুয়াডাঙ্গার ব্রাইট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পরীক্ষার্থী ২৩ জন।
তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকেই অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিশেষ করে খুলনার বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৬১ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছেন।
এমন ফলাফলের বিষয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে যেসব প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছিলেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের বক্তব্যও শোনা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালে যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিভুক্তি নবায়ন বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বোর্ড কর্তৃপক্ষের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ কিংবা অধিভুক্তি নবায়ন বন্ধের হুমকি দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফলের পেছনে শিক্ষকসংকট, পাঠদানের মান, নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক ডজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েও একজন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষাসহায়তা ও মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
যশোর বোর্ডের এবারের ফলাফল তাই কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার চিত্র নয়, বরং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান ও ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
