দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কোনো কৌশলগত বিলম্ব করছে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরুন কিংবা সরকার তাকে ফিরিয়ে আনুক, প্রত্যর্পণের দাবি থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা নেই।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনা বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করতে চায়। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা, আপনার আসতে হবে না, আপনাকে আমরা ধরে নিয়ে আসতে চাই।” তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া সামনে থাকবে।
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা হারানোর পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শেখ হাসিনা ওই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আপিলের সুযোগ নিয়েও জাহেদ উর রহমান মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় শেখ হাসিনার আর আপিল করার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায় বা দণ্ডের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে এবং ওই সময়সীমা পার হলে আর আপিল করা যাবে না। ৭ সেপ্টেম্বর প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলামও একই আইনি বিধানের কথা উল্লেখ করে বলেন, শেখ হাসিনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করেননি।
তবে এই বক্তব্যকে আদালতের নতুন কোনো আদেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট আইন এবং প্রধান কৌঁসুলির ব্যাখ্যার ভিত্তিতে দেওয়া বক্তব্য।
শেখ হাসিনা এর আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও থাকতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জাহেদ উর রহমান ভারতের ভূমিকা নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত তার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলন ও সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ বন্ধ রাখতে ভারত সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি আস্থা তৈরির একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হতে পারত।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, দুই দেশ ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ভারতীয় আইনে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত অনুরোধ চুক্তি ও দেশটির প্রত্যর্পণ আইনের আওতায় বিবেচিত হয়।
জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য শুধু প্রত্যর্পণ দাবি করছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সরকারের ঘোষিত অবস্থান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি এখন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে আছে। একদিকে ঢাকা তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অবস্থানে অনড় থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনা নিজেই ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ফলে আগামী মাসগুলোতে প্রত্যর্পণ ও তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে।
